বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে আজ রাতে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। এই ম্যাচে স্পেনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারেন আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। তার খেলার ধরণ অনেকটা দূরপাল্লার মিসাইলের মতো—যে কোনো মুহূর্তে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দিতে পারেন তিনি। ২০২২ বিশ্বকাপের স্মৃতি এখনও ভোলেনি ইংল্যান্ডের সমর্থকরা; সেবার সেমিফাইনালে ফার্নান্দেজের দূরপাল্লার গোল তাদের মনে এখনো দাগ কেটে আছে।
ফার্নান্দেজের খেলায় একইসঙ্গে ইউরোপিয়ান ও লাতিন প্রভাব দেখা যায়। দূরপাল্লার শটে গোল করাটা তার ইউরোপিয়ান ধাঁচ, আর লাতিন শিকড়টা ফুটে ওঠে যখন তিনি আকাশি-সাদা জার্সি পরেন। ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তে তিনি ছোটাছুটি করেন—দুই দলের মিডফিল্ডারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৌড়ান ফার্নান্দেজই। চার বছর আগে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টিনা দলের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় হয়েছিলেন তিনি। সেই সময় থেকেই আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডের ‘জেনারেল’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ফার্নান্দেজ।
প্রতিপক্ষের বক্সের আশপাশে সামান্য ফাঁকা জায়গা পেলেই তিনি পায়ের ‘আরপি রকেট লঞ্চার’ খুলে বসেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তিনি এমন চারটি দূরপাল্লার শট নিয়েছিলেন, যার একটিতে এসেছিল সমতাসূচক গোল। স্পেনের সম্ভাব্য ভয়ের জায়গা ঠিক এখানেই। ফার্নান্দেজ সব সময় গোল না করলেও তার গোলগুলো ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়, বিশেষ করে ম্যাচের শেষ দিকে। শেষ ষোলোয় মিসরের বিপক্ষে ৯৩ মিনিটে জয়সূচক গোল, কিংবা সর্বশেষ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে ৮৭ মিনিটের গোল—এসবই তার ক্লাচ পারফরম্যান্সের উদাহরণ। আর্জেন্টিনা দলে গোল করার মতো অনেক খেলোয়াড় থাকলেও সবাই যখন ব্যর্থ, তখনই ফার্নান্দেজের সেরাটা বেরিয়ে আসে।
মাঠে ফার্নান্দেজের উপস্থিতি হয়তো সবসময় চোখে পড়ে না, কিন্তু পরিসংখ্যানে তার প্রভাব স্পষ্ট। আর্জেন্টিনার চার মিডফিল্ডার—লিয়ান্দ্রো পারেদেস, ম্যাক আলিস্টার, রদ্রিগো দি পল ও ফার্নান্দেজ—এই চারজনের মধ্যে প্রতি ৯০ মিনিটে গোলের হার (০.৩২), শট (১.৯), সুযোগ তৈরি (০.৬) ও লাইন ব্রেকিং পাসে (১০) সবার উপরে আছেন ফার্নান্দেজ। রক্ষণেও তার অবদান কম নয়—প্রতি ৯০ মিনিটে ৪.৩টি বল দখল ও ১.৬টি ট্যাকল করেছেন তিনি। দৌড়েছেন গড়ে ১০.৭ কিলোমিটার, যা দুই দলের মধ্যে শুধু মার্ক কুকুরেয়াই তার চেয়ে বেশি দৌড়েছেন।
ফার্নান্দেজের খেলার ধরনকে অনেকেই আশি-নব্বই দশকের জাপানি মোটরসাইকেলের সাথে তুলনা করেন—যত চালানো যায়, ইঞ্জিন তত শক্তিশালী হয়। বিশ্বকাপের শুরুতে তাকে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে দেখা না গেলেও ম্যাচ যত গড়িয়েছে, ফার্নান্দেজ ততই নিজের সেরাটা বের করে এনেছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তিনি বল স্পর্শ করেছেন ১০৪ বার, যা দুই দলের মধ্যে সর্বোচ্চ। সফল পাসের হার ছিল ৯৮%! ইংল্যান্ড ম্যাচের পর ফার্নান্দেজ বলেছিলেন, ‘আগের ম্যাচগুলোয় আমি ঠিক স্বস্তিতে ছিলাম না। গোল করা ছাড়াও খেলতে ভালো লেগেছে। দেখা যাক রোববার কী হয়!’
এখন সেই দিন এসে গেছে। আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা আশা করছেন, আজ রাতে ফার্নান্দেজ আবারও গোল করে ‘টোপো গিগিও’ উদযাপন করবেন। ইংল্যান্ড ম্যাচে গোল করে ইংলিশ সমর্থকদের গ্যালারির সামনে গিয়ে তিনি হাত দুটো কানের ওপর তুলে সরু মুখ ও ঠোঁটে যে উদযাপনটি করেছিলেন, সেটি ১৯৫৮ সালের ইতালিয়ান পাপেট শো ‘টোপো গিগিও’র মুখের আদলে তৈরি। ২০০১ সালে বোকা জুনিয়র্সে হুয়ান রিকেলমে প্রথম এই উদযাপন করেছিলেন। পরে মেসিও সর্বশেষ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ডাচদের বিপক্ষে একইভাবে জয় উদযাপন করেন। ফার্নান্দেজ সেই উদযাপনকে ফাইনালের মঞ্চেও নিয়ে যেতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।




