দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পথে বড় বাধার সম্মুখীন হয়েছে শেইন। সম্প্রতি সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সংস্থাটি ৯৯ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের লাভের তুলনায় নাটকীয় বিপরীত চিত্র। হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে দাখিল করা খসড়া প্রসপেক্টাসের এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা সরাসরি শেইনের মুনাফায় আঘাত হেনেছে। এই ক্ষতির একটি অংশ এককালীন—৩২৮ মিলিয়ন ডলারের নগদ-বহির্ভূত হিসাবরক্ষণ সংক্রান্ত চার্জ, যা কনভার্টেবল প্রেফার্ড শেয়ারের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ থেকে এসেছে এবং তালিকাভুক্তির পর বিনিয়োগকারীদের শেয়ার সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরিত হলে এটি কার্যকর হয়।
বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শেইনের মার্কিন রাজস্ব বছরে ১৪.৩ শতাংশ কমে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালের মে মাসে ডি মিনিমিস আমদানি ছাড় প্রত্যাহার করায় স্বল্পমূল্যের পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। শুধু খরচ বাড়েনি, বরং শেইনের ব্যবসায়িক মডেলের মূল ভিত্তি—বিপুল পরিমাণ সস্তা পণ্য সরাসরি গ্রাহকের কাছে পাঠানো—সেই ভিত্তিটিই আঘাত পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যা ২০২৩ সালে শেইনের বার্ষিক রাজস্বের ২৯.৪ শতাংশ ছিল, বর্তমানে ত্রৈমাসিক বিক্রির মাত্র ২২.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বিপণন ও সরবরাহ খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং বিক্রি স্থবির থাকায় অপারেটিং মার্জিন আগের বছরের ৩.৯ শতাংশ থেকে কমে ২.৯ শতাংশ হয়েছে। শেইন এখন মার্কিন বাজারে দাম বাড়ানোর কথা ভাবছে, কিন্তু তাতে তার দামের সুবিধা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মার্কিন চাপের সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে ইউরোপের চ্যালেঞ্জ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি স্বল্পমূল্যের ই-কমার্স পণ্যের ওপর প্রায় ৩.৫০ ডলার সমতুল্য চার্জ আরোপ করেছে, যা শেইনের বার্ষিক রাজস্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইউরোপ থেকে আসে। নিজেদের দাখিলপত্রে শেইন সতর্ক করেছে যে ইউরোপে এই বিঘ্ন মার্কিন অভিজ্ঞতার সমান বা তার চেয়েও বড় হতে পারে।
সামগ্রিক বার্ষিক চিত্রটাও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে শেইনের নিট মুনাফা ৩৮.৭ শতাংশ কমে প্রায় ২.০৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যদিও রাজস্ব ৮ শতাংশ বেড়ে ৩৭.১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে—২০২৪ সালে যে ২০.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, তা থেকে অনেকটাই মন্থর।
এই পরিস্থিতিতে শেইন তার সবচেয়ে বড় বাধা ১০ জুলাই পার করেছে, যখন চীনের সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক হংকংয়ে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে আইপিও সম্পন্ন করে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার তোলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে শেইন, যার মূল্যায়ন ধরা হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার। এটি ২০২২ সালের ফান্ডিং রাউন্ডের প্রায় ৯৮.২ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪ রাউন্ডের ৬৪ বিলিয়ন ডলার থেকেও অনেক কম। কিছু বিনিয়োগকারী আরও কমিয়ে ৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে খবর।
মূল্যায়নের এই পতন শেইনের আইপিও যাত্রার গল্পই বলে। নিউ ইয়র্কে সরবরাহ চেইন ও শ্রমবিষয়ক রাজনৈতিক নজরদারির কারণে পরিকল্পনা বাতিল, লন্ডনে নিয়ন্ত্রক ও সুনামগত প্রতিকূলতায় স্থগিত, এবং অবশেষে হংকংয়ে পুনর্নির্দেশিত—যেখানে বেইজিংয়ের সমর্থন তুলনামূলক সহজ পথ তৈরি করছে। সিকোইয়া চায়না, টাইগার গ্লোবাল, জেনারেল আটলান্টিক ও আইডিজি ক্যাপিটালের মতো বিনিয়োগকারীরা যেকোনো মূল্যেই প্রথম তরলতার সুযোগ পেতে আগ্রহী।
তবে বিশ্লেষকরা সন্দিহান যে শেইন আইপিওতে বা সেকেন্ডারি মার্কেটে তার শেষ প্রাইভেট ফান্ডিং রাউন্ডের তুলনায় কোনো উল্লেখযোগ্য মূল্যায়ন বৃদ্ধি পাবে কিনা। বেইজিংভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক চ্যানসন অ্যান্ড কোং-এর পরিচালক শেন মেং মনে করেন, শেইন কয়েক বছর আগে লন্ডন বা নিউ ইয়র্কে তালিকাভুক্ত হতে পারলে আরও ভালো করত। ডেলয়েট চায়নার ক্যাপিটাল মার্কেট সার্ভিসেস গ্রুপের টনি হুয়াং জুন মাসের এক নোটে কিছুটা আশাবাদী সুরে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমলে ও হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুললে হংকংয়ের তালিকাভুক্তি শেইনের জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে তিনিও স্বীকার করেছেন যে শেইনের নিজস্ব অপারেশনাল ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জই শেষ পর্যন্ত মূল্য নির্ধারণে বেশি ভূমিকা রাখবে।
প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, আইপিও থেকে পাওয়া অর্থ প্রযুক্তি বিনিয়োগে (যেমন এআই-ভিত্তিক চাহিদা পূর্বাভাস), আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ, ব্র্যান্ড নির্মাণ ও কর্পোরেট দায়বদ্ধতা উদ্যোগে ব্যয় করা হবে। পাশাপাশি, গুয়াংডং প্রদেশে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে লজিস্টিকস হাব নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েও এগোচ্ছে শেইন, যখন সীমান্ত পেরিয়ে পণ্য পরিবহনের খরচ তাদের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।




