কানাডিয়ার শীর্ষস্থানীয় বীমা প্রতিষ্ঠান সান লাইফ ফিন্যান্সিয়াল এশিয়ার উচ্চ-নিট-ওয়ার্থ ব্যক্তিদের (এইচএনডব্লিউআই) জন্য একটি নতুন বৈশ্বিক প্রাইভেট ওয়েলথ প্ল্যাটফর্ম চালু করছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সম্পদ সৃষ্টি, সংরক্ষণ এবং আন্তঃসীমান্ত স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ধনী গ্রাহকদের সহায়তা করা। বীমা কোম্পানিগুলো এখন দ্রুত সম্পদ ব্যবস্থাপনার জায়গায় প্রবেশ করছে, কারণ তাদের বিদ্যমান গ্রাহকবেস ইতোমধ্যে আর্থিক সুরক্ষার জন্য তাদের পণ্য ব্যবহার করছে।

ক্যাপজেমিনির বিশ্ব সম্পদ প্রতিবেদন অনুসারে, এশিয়া বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল সম্পদ অঞ্চল। ২০২৫ সালে এই অঞ্চলের এইচএনডব্লিউআইয়ের সম্পদ ১০.৫% বৃদ্ধি পেয়ে ২৯.৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই অঞ্চলের ধনীদের জীবনযাত্রা একাধিক এখতিয়ার জুড়ে বিস্তৃত—তাদের পরিবারের সদস্যরা ও সম্পদ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। সান লাইফের গ্লোবাল হাই নেট ওয়ার্থ ব্যবসার প্রধান নির্বাহী সুজয় ঘোষ সিঙ্গাপুর অফিসে ফরচুনকে বলেন, ‘একজন সাধারণ গ্রাহক এখন সিঙ্গাপুরে থাকেন, তার সন্তানেরা যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করে এবং মালয়েশিয়া বা মিয়ামিতে একটি পারিবারিক বাড়ি থাকে।’

এশিয়ার ধনীরা দেশীয় অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থেকে সুরক্ষার জন্যও সম্পদ বৈচিত্র্যকরণ করছেন। ঘোষ ব্যাখ্যা করেন, ‘তারা বারমুডায় অর্থ বাড়ানোর জন্য একটি পলিসি, হংকঙে একটি সঞ্চয় পলিসি এবং সিঙ্গাপুরে সুরক্ষার জন্য একটি ইনডেক্সড ইউনিভার্সাল লাইফ পলিসি কিনতে পারেন।’ তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সম্পদ কেন্দ্র একে অপরের পরিপূরক—প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব নিয়ন্ত্রক সুবিধা ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। সিঙ্গাপুর তার স্থিতিশীলতা ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর জন্য জনপ্রিয়, অন্যদিকে বারমুডা উত্তর আমেরিকার নৈকট্য ও এইচএনডব্লিউ বীমা ব্যবস্থাপনার খ্যাতির কারণে আকর্ষণীয়।

সম্পদ ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার হিসেবে বীমার ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। সান লাইফের ২০২৫ সালের উত্তরাধিকার পরিকল্পনা গবেষণায় দেখা গেছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক ৬৭% এবং হংকংভিত্তিক ৪৪% গ্রাহক উদ্বিগ্ন যে তাদের সম্পদ পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও টিকবে না। এই উদ্বেগ বীমাকে শুধু সুরক্ষার মাধ্যম নয়, বরং সম্পদ পরিকল্পনা ও শাসনের হাতিয়ারে পরিণত করছে। ঘোষ বলেন, ‘গ্রাহকরা বীমার তারল্যের নিশ্চয়তা পছন্দ করেন, কারণ এটি নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ সরবরাহ করে। বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশে অনেকে সম্পদ পরিকল্পনায় স্থিতিস্থাপকতা ও নির্ভরযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেন।’

অন্যান্য বীমা কোম্পানিও তাদের পণ্যকে সম্পদ ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার হিসেবে অফার করছে। অ্যাক্সা গ্রেটার চায়নার প্রধান নির্বাহী স্যালি ওয়ান ফরচুনকে বলেন, ‘মহামারীর পর সীমান্ত খুলে গেলে আমরা দেখেছি মূল ভূখণ্ডের চীনা গ্রাহকরা হংকঙে ফিরে এসেছেন, কিন্তু তারা ছিলেন উচ্চ-নিট-ওয়ার্থ গ্রাহক, ব্যাপক ধনী নন।’ তিনি জানান, অনেক গ্রাহক এখন তাদের সম্পদের ১০% পর্যন্ত বীমা পলিসিতে রাখছেন, বিশেষ করে পারিবারিক ব্যবসা ও উত্তরাধিকার পরিকল্পনার জন্য। অ্যাক্সাও সম্প্রতি নিজস্ব ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে, যার নেতৃত্বেও রয়েছেন ওয়ান।

বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের ২০২৬ সালের বৈশ্বিক সম্পদ প্রতিবেদন অনুসারে, ভারত, ব্রাজিল, মেক্সিকোর মতো উদীয়মান বাজার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সম্পদ সৃষ্টির হটস্পট হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে উদীয়মান অর্থনীতির সম্পদ প্রায় ১২ ট্রিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাবে এবং এসব বাজারে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি আর্থিক সম্পদধারী ‘ধনী ও তার বেশি’ বিভাগটি বার্ষিক ৮% হারে বাড়বে। এই ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীকে ধরে রাখতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ছুটছে।

গত ২০ জুলাই ফরচুনের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ৫০০ র্যাঙ্কিংয়ে ৩৪তম স্থানে থাকা মালয়েশিয়ার ব্যাংক সিআইএমবি নিজস্ব প্রাইভেট ওয়েলথ অফার চালু করেছে, যা উপদেষ্টা সেবা ও কাস্টমাইজড সম্পদ সমাধান প্রদান করে। গ্রুপ কনজিউমার ব্যাংকিংয়ের প্রধান নির্বাহী হানিজ নাজলান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘আমরা বিশেষ করে আসিয়ান অঞ্চলে সম্পদের একটি বড় পুনর্বিন্যাস দেখছি। একাধিক প্রজন্ম একইসঙ্গে সম্পদ সৃষ্টি, সুরক্ষা ও আন্তঃপ্রজন্ম স্থানান্তরে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। গ্রাহকরা সম্পদ ব্যবস্থাপনার জটিলতা মোকাবিলায় বিশ্বস্ত অংশীদার খুঁজছেন।’

সান লাইফও প্রথাগত কেন্দ্রের বাইরে সম্প্রসারণের দিকে নজর দিচ্ছে। ঘোষ জানান, ‘আমরা লাতিন আমেরিকা থেকে ভারত এবং অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতি পর্যন্ত বৈশ্বিকভাবে তাকিয়ে আছি। অর্থ যেখানেই যাচ্ছে বা আসছে, আমরাও সেখানেই থাকতে চাই।’ এই কৌশল প্রতিষ্ঠানটিকে এশিয়ার ক্রমবর্ধমান ধনী বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করতে সহায়তা করবে।