কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অপব্যবহার করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চরিত্রহননের একটি ঘটনা সম্প্রতি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিএনপির লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের একটি ভুয়া ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, তিনি একটি বিছানায় বসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন এবং তাঁর সামনে রাখা ট্রেতে মদের বোতল, গ্লাস ও চানাচুর রয়েছে। তাঁর পাশে আরও দুজন ব্যক্তি উপস্থিত আছেন। ফেসবুকে ৭ লাখ ৫৯ হাজার অনুসারী বিশিষ্ট জ্যাকব মিল্টন নামের একটি পেজ থেকে ৭ জুলাই ছবিটি পোস্ট করা হলে তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হয়, বিএনপির এই এমপি যিনি নিজে মদপান ও আমোদ-প্রমোদে মগ্ন, তিনি এখন জনগণকে মাদক নির্মূলের নসিহত দিচ্ছেন। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পোস্টটিতে সাড়ে সাত হাজারের মতো প্রতিক্রিয়া, প্রায় সাড়ে চারশো মন্তব্য এবং এক হাজারের বেশি শেয়ার জমে। অধিকাংশ ব্যবহারকারী ছবিটি সত্য ভেবে নেতার বিরুদ্ধে নেতিবাচক মন্তব্য করলেও কিছু সচেতন ব্যবহারকারী সন্দেহ প্রকাশ করেন যে এটি এআই দিয়ে তৈরি হতে পারে।
দৈনিক বর্তমান বাংলা ও লক্ষ্মীপুর টিভির তদন্তে বেরিয়ে আসে যে ছবিটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি। ৫ জুলাই 'এআই দিয়ে এমপি সেলিমের ছবি বিকৃত করে প্রচারের অভিযোগে প্রতিবাদ' এবং ৭ জুলাই 'ফেইক ছবি ভাইরালে ক্ষোভ সংসদ সদস্য সেলিমের' শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আরও জানা যায়, প্রবাসী আরফান খান মাহিম ও জসিম উদ্দিন পৃথক ভিডিও বার্তায় ছবিটি যাচাই ছাড়াই প্রকাশের কথা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম ৬ জুলাই তার ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে পোস্ট করে বলেন, তার একটি ফেক ছবি ফেসবুকে ঘুরছে এবং উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং প্রশাসন এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নির্বিকার, তাই তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছবির ট্রেতে থাকা বোতলের ভেতরে একটি গ্লাসের অংশ অস্বাভাবিকভাবে ঢুকে আছে, যা এআই সম্পাদনার সাধারণ ত্রুটি। ZeroGPT টুল পরীক্ষায় ছবিটি ডিজিটালি সম্পাদিত বলে প্রমাণিত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ মেলে গুগলের SynthID প্রযুক্তির মাধ্যমে, যেখানে ট্রের অংশে Google AI-এর অদৃশ্য ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক শনাক্ত হয়—এটি নির্দেশ করে যে ওই অংশ গুগলের এআই প্রযুক্তি দিয়ে সম্পাদিত। যদিও আসল বা অপরিবর্তিত ছবিটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
শাহাদাত হোসেন সেলিম প্রথম আলোকে জানান, এআই ব্যবহার করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভুয়া ছবি তৈরি ও চরিত্রহননের প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তিনি সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান যে এ ধরনের অপপ্রচার বন্ধে আইনগত ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, নইলে সৎ রাজনীতিবিদদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে যাবে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে কেবল গুজব নয়, এআই-উৎপাদিত ভুয়া ভিজুয়াল কন্টেন্টও গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।




