ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার পর ভারত তার অপরিশোধিত তেল সরবরাহের প্রায় অর্ধেক হারিয়ে ফেলে। এর ফলে সারা দেশে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, সংকট এবং বিমান চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। এই ঘটনা দেশটির অর্থনীতিতে তেল আমদানি নির্ভরতার গভীর দুর্বলতা উন্মোচিত করে। তবে একটি নতুন বিশ্লেষণ বলছে, এই দুর্বলতাকেই সুযোগে পরিণত করা সম্ভব।

নিউ ইন্ডিয়া এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট সেন্টার ও এনার্জি ইনোভেশনের যৌথ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ভারতের প্রচুর কৃষি বর্জ্য ও বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা সবুজ হাইড্রোজেনকে একত্রিত করে টেকসই বিমান জ্বালানি (সাসটেইনেবল এভিয়েশন ফুয়েল-এসএএফ) উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব। বিশেষ করে ‘পাওয়ার-অ্যান্ড-বায়োমাস-টু-লিকুইডস’ (পিবিটিএল) প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত এসএএফ ২০৩০ সালের মধ্যেই তেল-ভিত্তিক জেট ফুয়েলের চেয়ে সস্তা হয়ে যেতে পারে।

ভারতে সবুজ হাইড্রোজেনের দাম ইতিমধ্যেই দ্রুত কমছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিলামে জুন ২০২৫ সালে প্রতি কেজি ৪.৬৭ ডলার থাকলেও ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩.২৩ ডলারে। বিশ্লেষণ বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে খরচ ৩ ডলারের নিচে নেমে আসতে পারে, যা পিবিটিএলকে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।

অন্যদিকে, ভারতে বিপুল পরিমাণে খড় ও অন্যান্য কৃষি বর্জ্য জমা হয়, যা মূলত জমি পরিষ্কার করতে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এতে দেশের শহরগুলোতে বায়ু দূষণের সৃষ্টি হয়, যার কারণে প্রতি বছর অনুমানিক ৪৪ হাজার থেকে ৯৮ হাজার অকাল মৃত্যু ঘটে। এই বর্জ্য সংগ্রহ করে তা পিবিটিএল জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহার করলে দূষণ কমানোর পাশাপাশি কৃষকদের অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

গবেষণা বলছে, স্বল্পমেয়াদে ভারত সাশ্রয়ী মূল্যের এসএএফ-এর বিশ্বের সবচেয়ে কম খরচের সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারে, যা অপরিশোধিত তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও সরবরাহ ঘাটতির বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধক হিসাবে কাজ করবে। দীর্ঘমেয়াদে এই শিল্প জীবাশ্ম জ্বালানিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং ভারতের সম্পূর্ণ বিমান চলাচলের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে।

ইউরোপে এসএএফ-এর নিয়ন্ত্রক চাহিদা বাড়ছে, যা ভারতীয় উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় বাজার তৈরি করছে। পিবিটিএল-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর মূল্য স্থিতিশীলতা। যেহেতু কাঁচামাল দেশীয় এবং চুক্তিগুলি রুপিতে করা যায়, তাই বৈশ্বিক ডলারের ওঠানামার ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে, অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে গেলে ডলারের শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে সরকারি সহায়তা অপরিহার্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পগুলোর ঝুঁকি কমানোর জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাইলট প্রকল্প চালু করতে হবে এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রিত বাজারে পিবিটিএল এসএএফ-এর সংযোগ স্থাপন করতে হবে।

ভারত যদি কৃষি বর্জ্য সরবরাহের সমন্বয় ঘটাতে পারে, সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদক, ইকুইপমেন্ট সরবরাহকারী, রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা ও বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা তৈরি করতে পারে, তবে এটি শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

তাই এই বিশ্লেষণ বলছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া ভারতের জন্য একটি চোখ খুলে দেওয়ার মতো ঘটনা। এখন সময় এসেছে নিজেদের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিজের হাতে নেওয়ার এবং টেকসই বিমান জ্বালানি শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার।