চীনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য সম্মাননা লু শিউন সাহিত্য পুরস্কার জিতেছেন খাবার ডেলিভারি কর্মী ওয়াং জিবিং। তাঁর কবিতার সংকলন ‘লো ফ্লাইট’ এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। ৫৬ বছর বয়সী ওয়াং ২০১৯ সালের দিকে ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর থেকে তাঁর কবিতা ও রচনা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
ওয়াং সেইসব নীল-কলার শ্রমিকদের একজন যাঁরা তাঁদের সাহিত্যকর্মের জন্য স্বীকৃতি পাচ্ছেন। এই কর্মীরা চীনের বিশাল গিগ অর্থনীতিতে প্রতিদিনের চাপ ও সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরছেন। পুরস্কার পাওয়ার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসকে ওয়াং বলেন, ‘আমি নিশ্বাস ধরে রেখেছিলাম এবং ভীষণ নার্ভাস ছিলাম। যখন ফল ঘোষণা হলো, সবকিছু স্থির হয়ে গেল।’ তিনি আরও বলেন, তাঁর ওপর সংবাদমাধ্যমের নজর মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
লু শিউন সাহিত্য পুরস্কারের অর্থমূল্য প্রকাশ্যে না জানানো হলেও ২০১৪ সালের হিসেবে তা ছিল ১ লাখ চীনা ইউয়ান (প্রায় ১৪ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার)। জিয়াংসু প্রদেশে জন্ম নেওয়া ওয়াং কিশোর বয়সেই আর্থিক সংকটের কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর তিনি নির্মাণশ্রমিক, আবর্জনা সংগ্রহকারী ও পথে দোকান দেওয়ার মতো বিভিন্ন পেশায় কাজ করেন, শেষ পর্যন্ত খাবার ডেলিভারিম্যান হন। তবে বই পড়ার প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো কমেনি। গত এক দশক ধরে তিনি নিজের কবিতা ও রচনা সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে আসছেন।
২০২২ সালে তাঁর একটি কবিতা ‘ম্যান ইন আ হারি’ ভাইরাল হয়। কবিতাটি ২০১৯ সালের এক ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত—এক গ্রাহক ভুল ঠিকানা দেওয়ায় তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা হতাশাজনক ডেলিভারি দিতে বাধ্য হন। ২০২৩ সালে তিনি তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘ম্যান ইন আ হারি: পোয়েমস অফ আ ফুড ডেলিভারি রাইডার’ প্রকাশ করেন। পুরস্কার জিতলেও ওয়াং জানান, তাঁর চাকরি ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত কাজ করতে চান। গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি বলেন, ‘আর্থিকভাবে আমার এই কাজের প্রয়োজন নেই, কিন্তু আমি কাজের পরিবেশ ভালোবাসি এবং এটি আমাকে সুস্থ রাখে। আমি একটি বাস্তবমুখী জীবন চাই এবং এই পুরস্কার কখনো আমার পরিচয় বদলাবে না।’
২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘লো ফ্লাইট’ কবিতার বইটি প্রায় ২০০ ডেলিভারি রাইডারের সাক্ষাৎকার ও জরিপের ভিত্তিতে রচিত। তাঁর কবিতার একটি পঙ্ক্তি: ‘কে বলে ডানা মেলার মানে উঁচুতে ওড়া? নিচুতে ওড়াও তো ওড়া।’ ওয়াংয়ের এই সাফল্যের সময় চীনে নীল-কলার শ্রমিকদের সাহিত্য জগতে পদার্পণ বাড়ছে। ২০২৩ সালে সাবেক কুরিয়ার হু আনইয়ানের স্মৃতিকথা ‘আই ডেলিভার পার্সেলস ইন বেইজিং’ চীনে বেস্টসেলার হয় এবং বিদেশেও মনোযোগ কাড়ে। এর ইংরেজি অনুবাদ গত বছর প্রকাশিত হয়েছে। আরেকটি বই ‘আই অ্যাম ফান ইউসু’—একজন অভিবাসী শ্রমিকের আত্মজৈবনিক রচনা—২০১৭ সালে চীনা ইন্টারনেটে ঝড় তোলে। এত বেশি গণমাধ্যমের অনুরোধ আসায় লেখক ফানকে সাময়িকভাবে বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়েছিল।
যাঁর নামে এই পুরস্কার, সেই লু শিউন বিংশ শতাব্দীর চীনের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখকদের একজন হিসেবে বিবেচিত। ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি চীনের ঐতিহ্যবাহী সমাজের সমালোচনা করেছেন। তাঁর রচনা আজও তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক। কয়েক বছর আগে তাঁর উপন্যাসের চরিত্র কং ইজি চীনের চাকরিহীন তরুণদের হতাশার প্রতীক হিসেবে মিমে পরিণত হয়েছিল।




