২০১৭ সালের ১২ জুন দুপুরের পর মুম্বাইয়ের আন্ধেরি ওয়েস্টের শ্রী ভৈরবনাথ এসআরএ সোসাইটির বাসিন্দারা একটি দুর্গন্ধ টের পান। পাঁচতলা ভবনের ৫০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে ওই গন্ধ আসছে বলে সন্দেহ হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ঘরের ভেতর টেলিভিশন ও এসি চলছিল। দরজা ভেঙে ঢুকে বিছানায় ২৭ বছর বয়সী অভিনেত্রী কৃত্তিকা চৌধুরীর পচন ধরা মরদেহ দেখতে পান সাব-ইন্সপেক্টর শ্রীকান্ত যাদব ও তার দল। মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। পাশেই পড়েছিল রক্তমাখা একটি ব্রাস নাকল এবং সাদা গুঁড়ো, যা মাদক বলে ধারণা পুলিশের। ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, মাথায় তিনটি আঘাতের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
হরিদ্বারের বাসিন্দা কৃত্তিকা প্রথমে দিল্লিতে একটি মোবাইল নেটওয়ার্ক কোম্পানিতে কাজ করতেন। সেখানেই বিজয় দ্বিবেদীর সঙ্গে পরিচয় ও বিয়ে হয়। পরে জানতে পারেন বিজয় আগে থেকেই বিবাহিত। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর ২০১১ সালে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান তিনি। মডেলিং ও অভিনয়ে মন দেন। ‘পরিচয়’, ‘সাবধান ইন্ডিয়া’-র মতো টিভি শো এবং বালাজির কয়েকটি প্রোডাকশনে কাজ করার সুযোগ পান। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রাজ্জো’ সিনেমায় কঙ্গনা রনৌতের বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, কৃত্তিকার ব্যক্তিগত জীবন বেশ ঘূর্ণিঝড়ের মধ্য দিয়ে গেছে। তার এক পুরোনো বন্ধু জানান, কৃত্তিকা মাদকাসক্ত ছিলেন এবং একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় একবার ভবনের ছাদ থেকে লাফ দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি। এ ঘটনায় হাউজিং সোসাইটির সদস্যরা ক্ষুব্ধ হলে পরে তিনি অন্য ফ্ল্যাটে উঠে যান। মৃত্যুর ছয় মাস আগে বিজয় দ্বিবেদী সম্পর্ক নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করলেও রাজি হননি কৃত্তিকা।
কৃত্তিকার ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে দুই অপরিচিত ব্যক্তি। খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা সময়েই তারা ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। এছাড়া ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় রক্তমাখা একটি পুরুষের শার্ট। কৃত্তিকার ভাই দীপক চৌধুরী জানান, তার বোনের কিছু গয়না ও দামি জিনিসপত্রও খোঁজ মিলছে না। শার্টটির ডিএনএ পরীক্ষা এবং গোপন তথ্যদাতার সহায়তায় পানভেল থেকে দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা হলো নালাসোপারার শাকিল নাসিম ও গোভান্ডির বাসুদেব।
জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশের দাবি, মাত্র ছয় হাজার রুপি পাওনা টাকার জেরেই এই খুন। নাসিম একজন মাদক ব্যবসায়ী, যে প্রায় এক বছর আগে কৃত্তিকাকে মাদক সরবরাহ করত। সেই বাকি টাকা আদায় করতেই সে চাপ দিচ্ছিল। কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর অর্থের প্রয়োজন ছিল তার। একাধিকবার তাকে ফিরিয়ে দেন কৃত্তিকা। অবশেষে ৮ জুন বাসুদেবকে সঙ্গে নিয়ে কৃত্তিকার ফ্ল্যাটে যায় নাসিম। প্রথমে তারা একসঙ্গে রাতের খাবার খান। এরপর শুরু হয় ঝগড়া। সঙ্গে আনা ব্রাস নাকল দিয়েই কৃত্তিকার মাথায় তিনবার আঘাত করে নাসিম। রক্তে শার্ট ভিজে গেলে সেটি খুলে রেখে যায় সে। এরপর টিভি ও এসি চালু করে বাইরে থেকে দরজা তালাবদ্ধ করে পালিয়ে যায় দুজন। উদ্দেশ্য ছিল, মৃত্যুর খবর যত দেরিতে ছড়ায় এবং কারও সন্দেহ না হয়।
কৃত্তিকার পরিবার অবশ্য ছয় হাজার টাকার জন্য খুনের এই তত্ত্ব মেনে নিতে পারেনি। পুলিশ ফ্ল্যাট থেকে ২২ হাজার রুপি নগদ উদ্ধার করে পরিবারের হাতে তুলে দিলেও ভাই দীপক প্রশ্ন তুলেছেন, যে অর্থ তার বোন সহজেই পরিশোধ করতে পারতেন, সেই সামান্য টাকার জন্য কেউ কি প্রাণ দিতে যায়? মরদেহের অবস্থার কারণে আন্ধেরি শ্মশানেই কৃত্তিকার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।




