পটুয়াখালী সদর ও দুমকী উপজেলার ৯টি গ্রামের প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ দেড় যুগ ধরে খালের পচা পানির দুর্গন্ধ ও জলাবদ্ধতার চরম ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। অপরিকল্পিতভাবে মৌকরণ খাল খনন এবং খালের পাশে বাঁধ নির্মাণের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। খালের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা, সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়েছে পানিদূষণও।

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিরুদ্ধে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বিবেচনা না করে পরিকল্পনাবহির্ভূতভাবে খালটি খননের অভিযোগ উঠেছে। সংস্থাটি খালের মাঝামাঝি স্থানে ছোট একটি বক্স কালভার্ট ও শেষাংশে ছোট একটি স্লুইসগেট নির্মাণ করায় পানিনিষ্কাশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নয়টি গ্রামের কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

পটুয়াখালী সদর উপজেলার মৌকরণ বাজার-সংলগ্ন এলাকায় মৌকরণ খালটির অবস্থান। খালের এক পাড়ে মৌকরণ গ্রাম, অপর পাড়ে দুমকী উপজেলার লেবুখালী গ্রাম। এ ছাড়াও খাল-সংলগ্ন রয়েছে শ্রীরামপুর, কার্তিপাশা, পূর্বকার্তিকপাশা, আঠারগাছিয়া, কালিকাপুর ও জামলা গ্রাম — মোট নয়টি গ্রামের বাসিন্দারা এ সমস্যায় জর্জরিত।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে মৌকরণ খাল খনন ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্প অনুযায়ী ১ হাজার ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০০ ফুট প্রস্থ খাল খননের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হলেও বাস্তবে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ ফুট প্রশস্ত করে খালটি খনন করা হয়। এর ফলে খালটির পানি ধারণক্ষমতা ও প্রবাহ উভয়ই কমে গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পূর্বকার্তিকপাশা গ্রামের খালের বড় অংশ কচুরিপানায় ভরে গেছে। অনেক স্থানে ফসলি জমি ও খালের পানির স্তর প্রায় সমান হয়ে গেছে। নিচু বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে রয়েছে। খালের পানির রং কালো ও দূষিত, সাথে ছড়াচ্ছে উৎকট দুর্গন্ধ। মৌকরণ এলাকার বাসিন্দা মো. সাগর আকন বলেন, বদ্ধ খালের পচা পানি তাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুকনা মৌসুমে পচা পানির দুর্গন্ধে তারা অতিষ্ঠ। খালের দুই পাশে অসংখ্য কৃষিজমি ও বসতবাড়ি থাকায় জলাবদ্ধতায় কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, আবার পরিবেশও দূষিত হচ্ছে।

খালে বাঁধ থাকায় মালামাল বহনকারী ট্রলার ও নৌকা মৌকরণ বাজারের ঘাটে ভিড়তে পারছে না বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ী খলিল আকন ও আমানুল ইসলাম। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন পানিপ্রবাহ বন্ধ থাকায় বিভিন্ন গ্রামের বর্জ্য ও গরু-মুরগির খামারের বর্জ্য খালে জমে পানিকে দূষিত করেছে। এই দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এবং গৃহপালিত গবাদিপশুদের মধ্যে রোগ দেখা দিচ্ছে।

মৌকরণ বাজার থেকে প্রায় ৮–৯ কিলোমিটার অংশ ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন শাখা খাল মৌকরণ খালের সঙ্গে মিশেছে। পানি জমে থাকার কারণে কোথাও কোথাও মুগডালসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত বৃষ্টির পানি কৃষিজমি ও লোকালয় থেকে পায়রা নদীতে নামতে না পারায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের প্রায় ৮০ শতাংশ ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

মৌকরণ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য দেলোয়ার হোসেন বলেন, পাউবো বাঁধ নির্মাণের সময় পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে পানিনিষ্কাশনের জন্য বিকল্প খাল ও স্লুইসগেট নির্মাণ করেছিল, ফলে খাল-সংলগ্ন গ্রামগুলোর পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। খালটি পরিকল্পনা অনুযায়ী পুনঃখনন এবং বক্স কালভার্টটি পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মাণ করা হলে সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে তিনি মত দেন।

মৌকরণ বাজার-সংলগ্ন খালটি সম্প্রতি পরিদর্শন করেছেন জানিয়ে পটুয়াখালীর পাউবো কার্যালয়ের সদ্যবিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, খালটির গভীরতা কমে যাওয়ায় পানির ধারণক্ষমতা ও প্রবাহ কমেছে, ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে চলতি অর্থবছরের মধ্যে খালটি পুনঃখননসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পটুয়াখালীর সাধারণ সম্পাদক কাজী সামসুর রহমান বলেন, পাউবোর পরিকল্পনাবহির্ভূত খাল খনন প্রকল্পের কারণে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন এবং জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করা উচিত।