ফ্রান্সের অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও ধনী ডি ব্রগলি পরিবারে ১৮৯২ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নেওয়া লুই ভিক্টর পিয়েরে রেমন্ড ডি ব্রগলি ছিলেন পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি 'প্রিন্স' উপাধি লাভ করেন, যা রোমান সাম্রাজ্যের উচ্চপদাধিকারীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। তাঁর প্রপিতামহ অস্ট্রিয়ার সম্রাটের কাছ থেকে এই উপাধি পান। বাবা ভিক্টর ছিলেন ডিউক, আর বড় ভাই মরিস ছিলেন তৎকালীন ইউরোপের একজন খ্যাতিমান পরীক্ষণ-পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি নিজ বাড়িতে বিশাল ল্যাবরেটরি স্থাপন করে গবেষণা করতেন।

শুরুর দিকে বাড়িতে প্রাইভেট টিউটরের কাছে পাঠ নিলেও পরে প্যারিসের বিখ্যাত লাইসি জ্যানসন দ্য সেইলি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। ১৯০৯ সালে দর্শন ও গণিতে ভালো ফল করে পাস করেন। এরপর ১৯১০ সালে সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রথমে ইতিহাস, পরে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন, কিন্তু কোনোটিতেই মন বসাতে পারেননি। এমনকি পদার্থবিজ্ঞানের একটি পরীক্ষায় ফেল করে বিজ্ঞান পড়াই ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি, যা তাঁকে গভীরভাবে হতাশ করে তোলে।

১৯১১ সালে বড় ভাই মরিসের সঙ্গে প্রথম সলভে কনফারেন্সে যাওয়ার সুযোগ হয় লুইয়ের। সেখানে ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে কোয়ান্টাম মেকানিকসের ক্রমবর্ধমান আলোচনা দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। ১৯১৩ সালে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পরই শুরু হয়ে যায় তাঁর বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মিলিটারির ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে পোস্টিং হয়। বড় ভাই মরিসের প্রভাবে সম্মুখযুদ্ধ থেকে রক্ষা পেয়ে আইফেল টাওয়ারের নিচে একটি রেডিওট্রান্সমিটার প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পান, যেখানে তিনি প্রায় ছয় বছর ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই অভিজ্ঞতাকে তিনি বেতার যোগাযোগের ইলেকট্রনিক পদ্ধতির হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ হিসেবে দেখেছেন।

১৯১৯ সালে সামরিক বাহিনী থেকে অব্যাহতি পেয়ে ফিরে এসে তিনি মরিসের ল্যাবে এক্স-রে ও ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট নিয়ে গবেষণায় অংশ নেন এবং বিশ্লেষণমূলক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। আলোর কণা ও তরঙ্গের দ্বৈত ধর্ম তখন প্রতিষ্ঠিত। ১৯২৩ সালে পরপর তিনটি গবেষণাপত্রে তিনি দেখান, আলো যেমন তরঙ্গ হয়েও কণার ধর্ম প্রদর্শন করে, তেমনি ইলেকট্রন কণা হয়েও তরঙ্গের ধর্ম প্রদর্শন করতে পারে—অর্থাৎ যেকোনো বস্তুকণারই তরঙ্গ-কণা দ্বৈত সত্তা রয়েছে। ১৯২৪ সালে তাঁর পিএইচডি থিসিসে এই তত্ত্বই বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন। আইনস্টাইন ও শ্রোডিঙ্গার এই তত্ত্বকে গুরুত্বের সঙ্গে নেন এবং শ্রোডিঙ্গার তাঁর ওয়েভ মেকানিকসে এটি প্রয়োগ করেন। মাত্র তিন বছরের মধ্যে ১৯২৭ সালে ক্লিনটন ডেভিডসন, লেস্টার জারমার এবং জর্জ থমসন পরীক্ষণের মাধ্যমে ইলেকট্রনের তরঙ্গধর্ম প্রমাণ করেন। এর স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২৯ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন লুই ডি ব্রগলি।

সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছর অবৈতনিক শিক্ষকতার পর ১৯৩২ সালে ইউনিভার্সিটি অব প্যারিসে যোগ দেন এবং হেনরি পয়েনকেয়ার ইনস্টিটিউটে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করা হয় তাঁর জন্যই, যেখানে তিনি ৩০ বছর কর্মরত ছিলেন। ১৯৩৩ সালে ফ্রান্সের একাডেমি অব সায়েন্সের সদস্য, ১৯৪২ সালে স্থায়ী সম্পাদক এবং ১৯৪৮ সালে আমেরিকান একাডেমি অব সায়েন্স ও ১৯৫৩ সালে রয়্যাল সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর তত্ত্ব থেকেই ম্যাগনেটিক লেন্সের ধারণা এসেছে, যা ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ উদ্ভাবনে সহায়ক হয়েছে।

ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত নম্র ও সহজ-সরল ছিলেন ডি ব্রগলি। পারিবারিক ঐশ্বর্য ও ক্ষমতা কখনো ব্যক্তিগত অর্জনে ব্যবহার করেননি। কোনো গাড়ি কিনেননি, বিয়ে করেননি, সলভে কনফারেন্স ও নোবেল গ্রহণ ছাড়া তেমন কোথাও ভ্রমণেও যাননি। ১৯৮৭ সালের ১৯ মার্চ ৯৫ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।