দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে ক্যাডেট কলেজের আদলে পৃথক আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ইতিমধ্যে 'নির্বাচিত এলাকাসমূহে ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণ প্রকল্প' শীর্ষক একটি প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে ছেলেদের জন্য একটি করে এবং মেয়েদের জন্য পৃথক আরেকটি করে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হবে, যেখানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা যাবে।
প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণে আনুমানিক ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার হিসাব করা হয়েছে। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রায় তিন একর জমির প্রয়োজন হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া ৬০০টি ১০ তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন নির্মাণে ব্যয় হবে আনুমানিক ২৪ হাজার কোটি টাকা, যেখানে প্রতিটি ভবনের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পৃথক ৬০০টি হোস্টেল নির্মাণে ব্যয় হবে আরও ৬ হাজার কোটি টাকা। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে, যার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, সরকারি পর্যায়ে 'সেন্টার অব এক্সেলেন্স' গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মুখ্য উদ্দেশ্য। দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বেসরকারি খাতের স্বনামধন্য কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদাহরণ টেনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকারি ব্যবস্থাতেও তেমনই মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সরকারি পর্যায়েই উন্নত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। তবে তিনি এ-ও জানান, নতুন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়নের প্রতিও সরকার সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
মাউশির মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ বলেছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত পিছিয়ে পড়া এলাকায় মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে প্রকল্পের ব্যয়, প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্যতা এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ সহায়তা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে দেশে সম্পূর্ণ আবাসিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই বললেই চলে। কিছু পুরোনো স্কুল অ্যান্ড কলেজে ছাত্রাবাস থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে বহু আবাসিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে, যার সঠিক সংখ্যার কোনো সরকারি হিসাব নেই। সরকারি ক্যাডেট কলেজের সংখ্যা মাত্র ১২টি, যার মধ্যে ৯টি ছেলে ও ৩টি মেয়েদের জন্য। সেখানে সপ্তম শ্রেণি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষা দেওয়া হয়।
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, সরকারিভাবে আবাসিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক। এর ফলে স্বল্প ও সীমিত আয়ের পরিবারের সন্তানদের জন্য আবাসিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে। তবে কোথায় কোথায় এই ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, তা নির্ধারণে আগে সমীক্ষা চালানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। পার্বত্য চট্টগ্রাম, হাওরাঞ্চল, চরাঞ্চল ও দুর্গম শিক্ষাবঞ্চিত এলাকায় পরিকল্পিতভাবে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে তা ইতিবাচক ফল দিতে পারে বলে মত দিয়েছেন অনেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ বলেছেন, সরকারের উদ্দেশ্য ভালো হলেও মূল প্রশ্ন হলো প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা নিয়ে। তাঁর মতে, দেশের সব এলাকায় আবাসিক মডেল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন আছে কি না, সেটি আগে বিবেচনা করা জরুরি। বর্তমানে বিদ্যমান প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় এই ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ না নিয়ে কিছুটা সময় নিয়ে পুরো শিক্ষাখাতকে সামনে রেখে সমন্বিত পরিকল্পনা করা উচিত, যাতে সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯৪ লাখের বেশি। এর মধ্যে ১৯ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ৭৮ লাখ। আর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সংখ্যা ১ হাজার ৫১৪, যেখানে শিক্ষার্থী রয়েছে ১৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। এ ছাড়া মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমেও বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ১৫ হাজার ২৯৩টি পদের মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি শূন্য, অর্থাৎ ১৮ শতাংশের বেশি পদে শিক্ষক নেই। মাউশির গবেষণা অনুযায়ী, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা কাঙ্ক্ষিত মানের নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা কোচিং ও গৃহশিক্ষকের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে মডেল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সব প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। কিছু ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষকসংকট বা ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাই নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে আগের উদ্যোগগুলোর সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।




