রাজবাড়ীর কালুখালী রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন এক অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হয়। ‘টিউবওয়েলের ফ্রেশ ঠান্ডা পানি’ বলে হাঁক দিয়ে বালতি হাতে ছুটে চলেন মুন্নু শেখ (৪৫)। ট্রেন থামামাত্র তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের জানালায় বোতলভর্তি ঠান্ডা পানি তুলে দেন তিনি, কিন্তু বিনিময়ে কোনো অর্থ নেন না।
কালুখালী উপজেলার পশ্চিম রতনদিয়া গ্রামের বাসিন্দা মুন্নু শেখের স্টেশনে একটি ভ্রাম্যমাণ চটপটির দোকান আছে। দুপুরবেলা চটপটি ও নলকূপের পানিভর্তি বোতল নিয়ে তিনি প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত হন। খুলনাগামী নকশিকাঁথা মেইল ট্রেন বেলা সাড়ে তিনটায় স্টেশনে পৌঁছালেই শুরু হয় তাঁর এই ব্যতিক্রমী সেবা। যাত্রীরা পানি পান শেষে বোতল জানালা দিয়ে নিচে রেখে দেন, সেগুলো পরে তিনি কুড়িয়ে নেন।
মুন্নু শেখের পরিবারে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে ছিল। ছেলে সবুজ শেখ (৯) ছিল সবার বড়। ২০১৮ সালে তার ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়লে মুন্নু নিয়মিত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাতায়াত করতেন মধুমতি ট্রেনে। ফেরার পথে অসুস্থ ছেলের জন্য এক বোতল পানি কেনার সামর্থ্যও অনেক সময় তাঁর ছিল না। ২০২০ সালে ক্যানসারের কাছে পরাজিত হয়ে সবুজ মারা যায়। এই হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার পর মুন্নু দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন, যত দিন বেঁচে থাকবেন, কোনো ট্রেনযাত্রীকে পানির জন্য কষ্ট পেতে দেবেন না।
সোমবার বিকেলে ওই স্টেশনের এক যাত্রী হেলাল মাহমুদ বলেন, ‘মুন্নু ভাইয়ের এই কাজ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। পানি জীবন, সেই পানি বিনা মূল্যে পান করিয়ে তিনি অসংখ্য মানুষের উপকার করছেন।’ ছেলের কথা মনে পড়লে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মুন্নু বলেন, ‘যখন কারও হাতে পানির বোতল তুলে দিই, আমার ছেলে সবুজের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তার স্মৃতি বুকে ধরেই এই কাজ করে যাচ্ছি। আর্থিক ক্ষতি হলেও কোনো কষ্ট নেই, মানুষের দোয়াই আমার বড় প্রাপ্তি।’
কালুখালী রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার দীনবন্ধু রায় জানান, দীর্ঘদিন ধরে মুন্নু শেখকে প্রতিদিন নকশিকাঁথা মেইল থামার পর যাত্রীদের মাঝে পানির বোতল বিতরণ করতে দেখা যায়। একজন সাধারণ ব্যক্তি হয়েও তাঁর এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
কালুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘প্রচার বা প্রতিদানের আশা না রেখে নিভৃতে মানবসেবা করে যাচ্ছেন মুন্নু শেখ। তাঁর এই নিঃস্বার্থ মানবিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ উপজেলা প্রশাসন তাঁকে সম্মাননা এবং কিছু আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে।’ প্রতিদিন দুটি বালতিতে ৩০ থেকে ৩৫টি পানির বোতল নিয়ে যাত্রীদের তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা তাঁর দোকান বন্ধ থাকে। ট্রেন চলে গেলে তিনি চটপটির ব্যবসা শুরু করেন এবং রাত ৯-১০টা পর্যন্ত কাজ সেরে বাড়ি ফেরেন।




