নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের ভুঁইয়ারবাগ এলাকায় অবস্থিত বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলের পাঠাগারটি যেন এক ভিন্ন জগতের সন্ধান দেয়। ক্লাস চলাকালীন সময়েও স্কুলের নিচতলার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষটিতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের বই পড়ার মগ্নতা। কেউ ডুবে আছে কিশোর উপন্যাসে, কেউবা বিজ্ঞানের চমৎকার জগতে, আবার কেউ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চায়। এখানে বই পড়া শুধু অবসর বিনোদন নয়, বরং তা শিক্ষাব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

বিদ্যালয়টিতে পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়া বইয়ের ওপর ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হয়, যাতে পাস করা বাধ্যতামূলক। এই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াও সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের বইয়ের সাথে সুস্থ বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে প্রায় দুই দশক ধরে এই অভিনব পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদ্যালয়টি পাঠাগারের জন্য বই সংগ্রহ শুরু করে; সময়ের সাথে সেই সংগ্রহ এখন প্রায় ১৭ হাজারে পৌঁছেছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থী, ৬২ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও ১০ জন কর্মচারী রয়েছেন।

বইয়ের ভান্ডারটি শুধু সংখ্যায় বড় নয়, গুণগত মানেও সমৃদ্ধ। শিশুতোষ গল্প, কবিতা, উপন্যাস, বিজ্ঞান, ইতিহাস, জীবনী, ধর্মীয় বইয়ের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি নানা বিষয়ের বই স্থান পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০, যা ইতিহাসচর্চায় আগ্রহীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের বইয়ের জন্য রয়েছে আলাদা দুটি তাক। হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আনিসুল হক, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ডেল কার্নেগি, নেলসন ম্যান্ডেলা, জুল ভার্নসহ বহু খ্যাতিমান লেখকের বই রয়েছে এই সংগ্রহে।

শিক্ষার্থীদের বইপাঠে উৎসাহিত করতে বিদ্যালয়টি বছরের ৫২ সপ্তাহই কাজ করে। বছরে অন্তত চারটি বই পড়া বাধ্যতামূলক, যেগুলোর ওপরই ক্লাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়। এই উদ্যোগের ফলে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত চারটি বইয়ের বাইরেও নিজের আগ্রহে আরও অনেক বই পড়ে ফেলে। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমাতুজ জোহরার ভাষ্য, ক্লাসের নির্দিষ্ট সময়ে লাইব্রেরিতে পড়তে হয়; এখন গল্প-উপন্যাসের প্রতি ভালোবাসা থেকে সে বছরে ১০ থেকে ১২টি বই পড়ে ফেলে। সহকারী লাইব্রেরিয়ান বিবি হাওয়া জানান, প্রতিটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে আলাদা বই নির্বাচন করা হয়েছে। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টি বই ইস্যু করা হয়; বেতন কার্ড জমা দিয়ে শিক্ষার্থীরা এক সপ্তাহের জন্য বই বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে। বছরে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমারের মতে, শিক্ষার্থীরা যেন বই হাতে নেয়, বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে — এটাই তাদের মূল লক্ষ্য। বই নাড়াচাড়া করার মাধ্যমেই একসময় পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় বলে তিনি মনে করেন। শিক্ষক কাকলী আক্তার জানান, ভালো ফলাফল এবং একজন সচেতন, মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে বই পড়ার বিকল্প নেই। সংস্কৃতিকর্মী রফিউর রাব্বি মনে করেন, পাঠ্যবইয়ের বাইরের এসব বই শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে এবং তাদের আলোকিত, চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে শিশু-কিশোরদের বই থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতার মধ্যেও বিদ্যানিকেতন হাইস্কুল যেন ভিন্ন এক পথ দেখাচ্ছে, যেখানে বই পড়া শিক্ষারই অপরিহার্য অংশ।