মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজার আবারও চাঙা হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তা গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রা স্পর্শ করে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস সোমবার বাজার খোলার পরই দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন লক্ষ্য করা যায়। ওই দিন ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে যায়, যা ২০২০ সালের মে মাসের পর এক দিনে সর্বোচ্চ বৃদ্ধির রেকর্ড।
গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) ১২টা ৫১ মিনিটের হিসাব অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৬৮ ডলার বা ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৪ দশমিক ৯৮ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ২ দশমিক ১ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ৭৯ ডলারে লেনদেন হয়। ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতিসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এই প্রথম তেলের দাম এত উচ্চতায় পৌঁছালো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সমঝোতা স্মারককে 'অকার্যকর' আখ্যা দিয়ে একতরফাভাবে তা বাতিল করেছেন। এর ফলস্বরূপ, উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা পুনরায় শুরু হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের মনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন করে চরম ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। এই আশঙ্কার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি, যার মাধ্যমে বিশ্বের একটি বিশাল অংশের তেল পরিবহন সম্পন্ন হয়।
ওয়াশিংটন পুনরায় ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ আরোপ করায় এই সংকীর্ণ জলপথে উভয় দেশের সামরিক উপস্থিতি ও তৎপরতা জোরদার হয়েছে। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের স্বাভাবিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণমুখী লেনে ওমানের জলসীমায় আমিরাতের দুইটি তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করে ইরানের দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এই আক্রমণে এক ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারান এবং আহত হন আরও আটজন।
এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, হরমুজ প্রণালিতে যেসব দেশের নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে যুক্তরাষ্ট্র, তাদের কাছ থেকে সেই সুরক্ষা সেবার ব্যয় আদায় করা হওয়া উচিত।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পুনরারোপিত অবরোধ এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের তৎপরতা বাজারে এক নতুন ঝুঁকির আবহ সৃষ্টি করেছে। তার মতে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ না হলেও দুই পক্ষের বর্তমান অবস্থানের কারণে জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চিত।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা পরিচালিত হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, মঙ্গলবার ভোরে বন্দর আব্বাসে সাতটি এবং কিশ দ্বীপে আরও দুটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। এই সংকট আরও বিস্তৃত হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, এবং তাদের দাবি, সৌদি নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানঘাঁটিতে তারা আঘাত হেনেছে।
গ্যাবেলি ফান্ডসের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক সাইমন ওয়ং সতর্ক করে বলেছেন, হুতিরা যদি লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে সমগ্র অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা আরও গভীর হবে।


