রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি রাষ্ট্রের অধীন এবং জনস্বার্থমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত থাকে। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী সেগুলোর দেখভাল বা বিতরণের দায়িত্ব পেলেই মালিক হয়ে যান না, বরং তিনি মূলত একজন আমানতদার হিসেবে দায়িত্বশীল থাকেন। ইসলাম আমানতের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানতগুলো তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮) ইসলামি আইন শাস্ত্রে প্রতিনিধিত্বের মূলনীতি হলো, যে পরিমাণ ক্ষমতা অর্পণ করা হয়, প্রতিনিধি কেবল সেই সীমার মধ্যেই তা প্রয়োগের অধিকারী হন। কর্তৃত্ব যতটুকু, বৈধ অধিকার ততটুকুই। (আলাউদ্দিন কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে, ৭/৪২৪)

শরিয়তসম্মত কেনাবেচার মৌলিক শর্ত হলো, বিক্রেতার কাছে বস্তুটির বৈধ মালিকানা থাকতে হবে অথবা মালিকের স্পষ্ট অনুমতি থাকতে হবে। হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যা তোমার কাছে (মালিকানায়) নেই, তা বিক্রি করো না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫০৩) এই নীতির আলোকে স্পষ্ট যে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি মালামাল ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি করার অধিকার সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নেই। বস্তুটি পুরোনো, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত বা নতুন মাল আসায় অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়লেও একই বিধান প্রযোজ্য থাকবে।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো অফিসে পড়ে থাকা পুরোনো কম্পিউটার কোনো কর্মচারী পরিচিতজনের কাছে কম দামে বিক্রি করলেন। ক্রেতা যদি জানেন যে, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর তা বিক্রি করার অনুমতি নেই, তাহলে শুধুমাত্র সস্তা দামের কারণে তা কেনা তাঁর জন্য বৈধ হবে না। শুধু কেনাবেচাই নয়, অনুমতি ছাড়া অফিসের সম্পদ বাড়িতে নেওয়া, ব্যক্তিগত কাজে লাগানো বা অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়াও আমানতের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। (ইবনে নুজাইম মিসরি, আল-বাহরুর রায়েক, ৬/১১৯)

তবে সব রাষ্ট্রীয় সামগ্রী চিরকাল অবিক্রেয়, এমনটি নয়। কোনো সম্পদ পুরোনো, অকেজো বা উদ্বৃত্ত হয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ বিধিসম্মত পদ্ধতিতে নিলাম, টেন্ডার বা অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় তা বিক্রি করতে পারে। সেক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন ও কর্তৃত্ব থাকায় বিষয়টি ভিন্ন হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই নিষেধের মূল কারণ সম্পদটি সরকারি হওয়া নয়; বরং যার হাতে সম্পদটি রয়েছে, তার বিক্রির বৈধ কর্তৃত্ব আছে কি না — মূল প্রশ্নটি সেখানেই। (আলাউদ্দিন কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে, ৭/৪২৪)

ক্রেতা যদি জানেন যে, সম্পদটি অননুমোদিতভাবে বিক্রি হচ্ছে, তবুও সস্তার লোভে কিনে নেন, তাহলে তিনি শুধু ক্রেতা হিসেবে দায়মুক্ত থাকতে পারবেন না। তাঁর অর্থ প্রদান বিক্রেতাকে অবৈধভাবে সম্পদ হাতছাড়া করতে সহায়তা করেছে। জেনেশুনে এমন কেনাবেচায় অংশ নেওয়া পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)

অপরদিকে, কেউ যদি পণ্য কেনার সময় বিষয়টি না জানেন এবং পরে জানতে পারেন যে, সেটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ছিল এবং বিক্রেতার বৈধ অনুমতি ছিল না, তাহলে তা নিজের কাছে রাখা বৈধ নয়। তাঁকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের কাছে তা ফেরত দিতে হবে এবং বিক্রেতার কাছ থেকে নিজের প্রদত্ত মূল্য ফেরত নিতে হবে। কারণ, জনসাধারণের সম্পদের অধিকার জনসাধারণের জন্যই প্রতিষ্ঠিত, কোনো কর্মকর্তা নিজের ইচ্ছায় সে অধিকার বাতিল করে অন্য কাউকে মালিক বানিয়ে দিতে পারেন না। (শামসুদ্দিন সারাখসি, আল-মাবসুত, ২৩/২০৩)

যদি ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয় — যেমন পণ্যটি নষ্ট হয়ে গেছে, ব্যবহার হয়ে গেছে বা অন্য কোনো কারণে ফেরত দেওয়ার সুযোগ নেই — তাহলে তার সমজাতীয় বস্তু ফেরত দিতে হবে। সেটিও সম্ভব না হলে তার মূল্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা বৈধ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। অন্যায়ভাবে দখল করা সম্পদের ক্ষেত্রে মূল বস্তু ফেরত দেওয়াই বিধান; তা সম্ভব না হলে সমজাতীয় বস্তু, আর তা-ও সম্ভব না হলে তার মূল্য দেওয়ার বিধান রয়েছে। (আলাউদ্দিন কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে, ১০/২২)