অলসতাকে শুধুমাত্র শারীরিক স্থূলতা হিসেবে নয়, বরং একটি আত্মিক ব্যাধি হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে ইসলামে। এই রোগ মানুষের ভেতরের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয় এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে বারবার পিছিয়ে দেয়। ইসলামি দৃষ্টিতে, অলসতা মানুষকে দুনিয়ার কর্মক্ষেত্রেও পিছিয়ে দেয় এবং পরকালের প্রস্তুতিতেও উদাসীন করে তোলে। একজন অলস ব্যক্তি নিজের ক্ষতির পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের জন্যও বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
মহানবী মুহাম্মদ (সা.) নিজে ছিলেন অত্যন্ত কর্মঠ, দূরদর্শী ও উদ্যমী। অলসতার অভিশাপ থেকে বাঁচতে তিনি নিয়মিত আল্লাহর কাছে বিশেষ দোয়া করতেন এবং সাহাবিদেরও প্রাণবন্ত জীবনযাপনের কৌশল শিখিয়েছেন।
১. অলসতা থেকে আশ্রয়ের বিশেষ দোয়া: অলসতা দূর করার প্রথম শর্ত হলো নিজের এই দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। নবী (সা.) নিজে পাপমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও উম্মতকে শিক্ষা দিতে প্রতিদিন অলসতা থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করতেন। তাঁর শেখানো দোয়াটি হলো: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল জুবনি ওয়াল হারামি ওয়াল বুখলি, ওয়া আউজু বিকা মিন আজাবিল কবরি, ওয়া আউজু বিকা মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাতি।” অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা, বার্ধক্য ও কৃপণতা থেকে এবং কবরের আজাব ও জীবনের ফিতনা থেকে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২২) ২. ভোরে কাজের সূচনা: অলসতা কাটানোর সবচেয়ে বড় কৌশল হলো দিন শুরু করা ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই। রাত জেগে থাকা এবং দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা শরীরের শক্তি ও মনকে কেড়ে নেয়। দেরিতে উঠলে সারাদিনের কাজের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং মনে আলসেমি ভর করে। নবী (সা.) ভোরের সময়ের বরকতের জন্য দোয়া করেছেন, “হে আল্লাহ, আমার উম্মতকে ভোরের প্রহরে বিশেষ বরকত দান করুন।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৬)। সূর্য ওঠার আগে জেগে উঠলে শরীর সতেজ থাকে, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ে এবং দৈনন্দিন কাজ সহজে সম্পন্ন হয়। ৩. অলসতা দূর করতে অজু: ঘুম থেকে ওঠার পর যে শারীরিক ও মানসিক অলসতা ঘিরে ধরে, তা কাটানোর একটি মনস্তাত্ত্বিক উপায়ও শিখিয়েছেন নবী (সা.)। হাদিসে এসেছে, ঘুমানোর সময় শয়তান মাথার পেছনে তিনটি গিট দেয়। কিন্তু মানুষ জেগে আল্লাহকে স্মরণ করলে একটি গিট খুলে যায়, অজু করলে দ্বিতীয়টি এবং নামাজ আদায় করলে তৃতীয় গিটটিও খুলে যায়। ফলে সে প্রফুল্ল ও কর্মচঞ্চল শরীরে সকাল শুরু করে। অন্যথায় সে কলুষিত মন ও অলস শরীর নিয়ে জেগে ওঠে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪২)। তাই যথাসময়ে ফজরের নামাজ ও শারীরিক পরিচ্ছন্নতা অলসতার শিকল ভাঙার কার্যকর পথ। ৪. ছোট পদক্ষেপ ও কাজের ধারাবাহিকতা: অনেক সময় মানুষ একসাথে বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং কাজের বিশাল ভার দেখে গড়িমসি করে। নবী (সা.) ছোট ছোট পদক্ষেপে কাজের গতি বজায় রাখতে শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়; যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)। বড় প্রকল্পকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে প্রতিদিন অল্প করে শেষ করার অভ্যাস অলসতাকে বাধা হতে দেয় না। ৫. কর্মঠ হওয়া এবং হাল না ছাড়া: ইসলাম কোনো অবস্থাতেই নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন সমর্থন করে না। নবী (সা.) বলেছেন, “শক্তিশালী ও কর্মক্ষম মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে অধিক উত্তম ও প্রিয়... তুমি কল্যাণকর বিষয় পাওয়ার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং কোনো অবস্থাতেই অলস হয়ে বসে থেকো না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)। কোরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, “সুতরাং যখনই কোনো কাজ থেকে অবসর পাও, তখন পরবর্তী কর্মপ্রচেষ্টায় কঠোর পরিশ্রম করো, এবং তোমার রবের দিকেই মনোনিবেশ করো।” (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৭-৮)।অলসতার শৃঙ্খল ভেঙে কর্মচঞ্চল জীবন গড়ে তোলা আসলে কঠিন কিছু নয়; এটি প্রতিদিনের সহজ কিছু অভ্যাসের সমন্বয় মাত্র।




