প্রকৃতির এক অনন্য দান হলো বৃষ্টি, যা ঐতিহাসিকভাবেই মানুষের জীবন ও কৃষিকাজের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। গ্রামীণ জীবনযাত্রায় দেখা যেত, রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজেও মানুষ সুস্থ থাকত। বিশেষ করে পুরনো দিনে গৃহিণীরা রান্নাবান্নার জন্য বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে রাখতেন, যা তাঁদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের অংশ ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিকভাবেই বিশুদ্ধ বা 'সফ্ট ওয়াটার', কারণ এতে ভূগর্ভস্থ পানির মতো অতিরিক্ত আয়রন, ক্লোরিন বা ক্ষতিকর খনিজ উপাদানের উপস্থিতি থাকে না।
তবে আধুনিক শিল্পায়িত ও জনবহুল নগরে বৃষ্টির পানির ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। বায়ুমণ্ডলে বিদ্যমান ধোঁয়া, রাসায়নিক দূষণ এবং ধুলিকণা বৃষ্টির ফোঁটার সাথে মিশে পৃথিবীতে নেমে আসে। বিশেষ করে ঢাকার মতো বড় শহরগুলোতে বৃষ্টি শুরুর প্রথম ১৫ থেকে ২০ মিনিটের পানি সংগ্রহ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রথম পশলা বৃষ্টির মাধ্যমে বাতাসের দূষিত কণাগুলো ধুয়ে যাওয়ার পর পানি সংগ্রহ করা শ্রেয় এবং ব্যবহারের আগে তা ফুটিয়ে বা ফিল্টার করে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, বৃষ্টি আল্লাহর বিশেষ রহমত। পবিত্র কোরআনে একে 'মা-আন মুবারাকা' (বরকতময় পানি) এবং 'মা-আন তহুরা' (পবিত্রকারী পানি) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুরা কাফ এবং সুরা আনফালের আয়াতে উল্লেখ আছে যে, এই বরকতময় পানির মাধ্যমেই উদ্যান ও শস্য উৎপন্ন হয় এবং এর দ্বারা মানুষ বাহ্যিক ও আত্মিক অপবিত্রতা থেকে মুক্তি পায়। সুরা আরাফে জানানো হয়েছে, বৃষ্টি আসার আগে আল্লাহ সুসংবাদস্বরূপ বাতাস প্রেরণ করেন, যা মৃত পৃথিবীকে পুনরায় সজীব করে তোলে এবং পরকালের পুনরুত্থানের নিদর্শন হিসেবে কাজ করে।
রাসুল (সা.) বৃষ্টির মুহূর্তটিকে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক বিশেষ সুযোগ হিসেবে দেখতেন। সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, বৃষ্টি শুরু হলে তিনি তাঁর শরীরের চাদর সরিয়ে কিছু অংশ উন্মুক্ত করতেন যাতে বৃষ্টির পানি সরাসরি স্পর্শ করতে পারে। সাহাবীদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, এই পানি এইমাত্র তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নবসৃষ্ট হয়ে এসেছে। এছাড়া বৃষ্টি শুরু হলে তিনি 'আল্লাহুম্মা সায়্যিবান নাফিআ' দোয়াটি পাঠ করতেন, যার অর্থ—হে আল্লাহ, এই বৃষ্টিকে আমাদের জন্য ফলপ্রসূ ও উপকারী করে দিন।
হাদিস অনুযায়ী, বৃষ্টির সময় দোয়া কবুলের বিশেষ সম্ভাবনা থাকে। সুনানে আবু দাউদের বর্ণনা মতে, আজানের সময় এবং বৃষ্টি বর্ষণের সময় দোয়া খুব কম প্রত্যাখ্যাত হয়। বৃষ্টির সময় মুমিনের জন্য আরও কিছু আমল বর্ণিত হয়েছে। যেমন, মেঘের গর্জন বা বিজলি চমকালে পূর্ববর্তী জাতিগুলোর আজাবের কথা স্মরণ করে নবীজি (সা.) তাসবিহ পাঠ করতেন। আবার বৃষ্টি যদি অতিবৃষ্টির রূপ নেয় এবং ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়, তবে তিনি দোয়া করতেন—'আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা আলাইনা', অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমাদের আশপাশে বর্ষণ করুন, আমাদের ধ্বংসের জন্য আমাদের ওপর নয়। সবশেষে বৃষ্টি শেষে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।




