‘তরজুমান আল আশওয়াক্ব’—যার বাংলা অনুবাদ হতে পারে ‘বাসনার বয়াতি’—ইবনুল আরাবির সাহিত্যকর্মের মধ্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ষাট থেকে একষট্টি কবিতার এই সংকলনটি তিনি নিবেদন করেন নিজাম নামের এক বিদুষী নারীর উদ্দেশ্যে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মক্কায় বসবাসরত এই নারী ছিলেন সুফি সাধক, আধ্যাত্মিক শিক্ষক এবং ‘আইনুশ শামসি ওয়াল বাহা’—অর্থাৎ জ্যোতি ও মহিমার উৎস—উপাধিধারী এক পণ্ডিতা। তাঁর রূপ ও গুণের বর্ণনায় কবি কোনো সঙ্কোচ দেখাননি; বরং দেবী ও মানবী উভয় রূপেই তাঁর সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছেন।
এই নিজামের সঙ্গে ইবনুল আরাবির প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ১২০২ খ্রিষ্টাব্দে, যখন তিনি মক্কা সফরে গিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বিখ্যাত ধর্মবেত্তা ফখরুন নিসা বিনতে রুস্তমের কাছে ছাত্রত্ব গ্রহণের আশা করেছিলেন। কিন্তু বয়সের কারণে ফখরুন নিসা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাঁর ভাই মাকিনউদ্দিন আবু শাজা জহির ইবনে রুস্তম আল ইসপাহানির কাছে পাঠিয়ে দেন; তাঁর হয়ে ইবনুল আরাবিকে হাদিসের সনদ দেওয়ার নির্দেশও দেন। মাকিনউদ্দিন ছিলেন নিজামের পিতা, আর ফখরুন নিসা ছিলেন তাঁর ফুফু। মাকিনউদ্দিনের গৃহেই ইবনুল আরাবি প্রথম নিজামকে দেখেন।
তবে ‘তরজুমান আল আশওয়াক্ব’—এর ভূমিকায় ইবনুল আরাবি নিজে একটি ভিন্ন বয়ান দিয়েছেন। একদিন কাবা শরিফের তাওয়াফকালে তিনি ভাবাবিষ্ট হয়ে উচ্চস্বরে নিজের কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। হঠাৎ তাঁর কাঁধে কারো স্পর্শ অনুভব করেন; এক নারী তাঁকে তিরস্কার করেন—কারণ কবিতার শব্দাবলি তাঁর মতো সুফির জন্য অনুপযুক্ত। গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে—কাবা প্রদক্ষিণের সময় মানবী নিজামের সঙ্গে কি বাস্তব সাক্ষাৎ হয়েছিল, নাকি তখন তিনি কবির অন্তর্জগতে কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন? প্রথম সাক্ষাতেই নিজাম এমন গভীর ছাপ ফেলেন যে এরপর থেকে বাস্তব ও অতীন্দ্রিয় উভয় মাত্রায় তিনি কবিকে তাড়িত করতে থাকেন।
নিজামের প্রতি ইবনুল আরাবির আকুলতার তীব্রতা তাঁর নিজের ভাষায় ফুটে ওঠে—‘এই বইয়ের প্রতিটি নামের মাধ্যমে আমি তাঁকেই সম্বোধন করি; আমার হাহাকার কেবল তাঁর আবাসকে ঘিরেই!’ নিজাম তাঁর নামের অর্থের মতোই সুন্দর—নিজাম মানে সুর, ঐকতান ও সমন্বয়। কবি তাঁর মধ্যে মহাজাগতিক ছন্দময়তা আবিষ্কার করেন। নিজামের মূল ধাতু ‘নজম’—অর্থ কবিতা—এই কারণেই হয়তো তাঁর রূপ প্রকাশের বাহন হিসেবে কবিতাকে বেছে নেন কবি। তিনি লেখেন, ‘সে আমার লক্ষ্যবস্তু, আমার আকাঙ্ক্ষা; নিষ্কলুষ এক কুমারী।’
মক্কা নগরী ইবনুল আরাবির জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এখানেই তিনি তাঁর প্রধান রচনা ‘আল ফুতুহাত আল মক্কিয়্যাহ’ লিখতে শুরু করেন, যা সম্পন্ন হতে তাঁর জীবনের বত্রিশটি বছর ব্যয় হয়। এখানেই নিজামের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে; এই প্রণয় তাঁকে দিয়েছিল বসন্তের তাজা বাতাস এবং এক চিরস্থায়ী মধুময় যাতনা।
কবিতার নানা ছত্রে তিনি নিজামের মধুময় ওষ্ঠ্য, উন্নত বক্ষ, কুমারীসুলভ লাজুকতা ও আবেগপ্রবণ মনোভাবের চিত্র অঙ্কন করেছেন। এই সৌন্দর্যকে কবি মহান স্রষ্টার ঐশ্বরিক উপহার হিসেবে দেখেন। তাই নিজামকে পাওয়ার বাসনা শেষ পর্যন্ত স্রষ্টাকে পাওয়ার আকুলতায় রূপ নেয়। তাঁর আয়নায় যেন প্রতিভাত হয় স্রষ্টার পরম সৌন্দর্য। গুণের বয়ানে ইবনুল আরাবি লেখেন—‘তিনি একজন দরবেশ ও তপস্বী। দুই পবিত্র নগরীর আধ্যাত্মিক শিক্ষক। তিনি কথা বললে সবাই চুপ হয়ে যায়। স্বকীয় শৈলীতে সংক্ষিপ্ত বা প্রাঞ্জলভাবে কথা বলেন। জ্ঞানীদের মাঝে তিনি জ্যোতিষ্ক, মার্জিতদের মাঝে সুদৃশ্য বাগান। নিখুঁতভাবে তৈরি হারের মূল রত্নের মতো অতুলনীয় ও সর্বোচ্চ দামি।’ নিজামকে কবি পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন—বোধ, শিক্ষা, আধ্যাত্মিকতা এবং বাহ্যিক ও অন্তর্গত রূপে অতুলনীয়। তিনি লেখেন, ‘কামনায় মরে যাই, আবেগেতে গলি; আমার যে দশা, তাঁরও তো সেই একই!’
কবিতাগুলোতে নিজাম কখনো রক্ত-মাংসের নারী, কখনো স্বপ্ন, কখনো মরীচিকা—তিনি আছেন, আবার নেই; তাঁর অনুপস্থিতিই যেন বেশি করে উপস্থিতি! তিনি নির্দয়, আবার সহানুভূতিশীল; প্রতিনিয়ত কবিকে হৃদয়ের গভীরে তাঁর অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে বাধ্য করেন। যদিও তিনি সপরিবারে মক্কায় বসবাস করতেন, তাঁর শিকড় ছিল পারস্যে—বর্তমান ইরাকে। তাঁদের মধ্যে বিরহের অনুভূতি প্রবল ছিল। একটি কবিতার অংশে কবি লেখেন—‘তিনি ইরাকের মেয়ে, আমার ইমামের মেয়ে, বিপরীতে আমি ইয়েমেনের ছেলে। কেউ কি কখনো শুনেছ তেলে আর জলে মিলন হতে!’ এ চরণে বিরহের বেদনার পাশাপাশি আরব ও অনারবের বৈসাদৃশ্যের দিকেও কি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে?
ইবনুল আরাবির কাছে নিজাম এমন এক আলো যা প্রেমিকের হৃদয় আলোকিত করে। কিছু কবিতায় কবি নিজামের মুখ দিয়েও কথা বলিয়েছেন—‘তাঁর হৃদয়ে আমার সতত বসতি, এটাই কি তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়?’ অথবা—‘তুমি নিজেই বরং প্রেমিক হয়ে যাও, এমন প্রেমিক, যাঁর তালাশে থাকেন স্বয়ং প্রেমাস্পদ! তোমার উচ্চারণ তখন হবে প্রজ্বলিত আগুনের মতো!’ অন্যত্র কবি লেখেন—‘তাঁর দর্শনে অন্ধকার রজনী মোর আলোকিত হয়, তাঁর কেশরাজির অন্তরালে উজ্জ্বল দিন মোর আঁধারে হারায়!’ কিংবা—‘তাঁর ঝলমলে উপস্থিতি যেন সূর্য, তাঁর দীর্ঘ চুল যেন রাত; সূর্য ও রাতের মিলন হলো!’
এই সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নিজামের সঙ্গে প্রণয় নিয়ে ইবনুল আরাবিকে নৈতিক পতন ও চরিত্রহীনতার অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছে। কোনো গবেষক তাঁদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ বলে অনুমান করেছেন এবং কাবা তাওয়াফের সাক্ষাৎকে বিয়ের প্রস্তাব হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। কিন্তু সর্বাধিক গৃহীত মত হলো—তাঁদের মধ্যে কোনো বৈবাহিক বা জৈবিক সম্পর্ক ছিল না; ছিল গভীর এক বন্ধুত্ব, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে আধ্যাত্মিকতায় রূপ নেয়। গবেষক সাদিয়া শেখের ভাষায়—‘নিজাম চিরকুমারী ছিলেন এবং আধ্যাত্মিকভাবে অনন্য উচ্চতা অর্জন করেছিলেন।’
তরজুমান আল আশওয়াক্ব ইবনুল আরাবির কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত। জীবনের শেষদিকে তিনি দামেস্কে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রাত্যহিক সভায় এই কবিতাগুলো আবৃত্তি করা হতো এবং তা আবৃত্তি করতেন স্বয়ং কবি নিজে। ইবনুল আরাবির সুফি দর্শন নিয়ে বাংলায় গবেষণা দীর্ঘদিন ধরে চললেও, নিজামের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বাংলাভাষায় লেখার অভাব রয়েছে। বর্তমান লেখাটি তাই কেবল একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ, যা তরঙ্গিত হয়ে আরও গবেষণায় কাউকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ইরিনা কুজমিনস্কির রচনা ‘নিজাম, ইবনে আরাবি অ্যান্ড দি ইম্পরট্যান্স অব বিউটি অ্যাজ আ পাথ টু গড’।




