যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিক ও মেরিনরা বুধবার পর্যন্ত ২৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে রয়েছেন। আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘতম এই মোতায়েনের মধ্যে জাহাজে অবস্থানরত সদস্যদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে বলে আশঙ্কা করছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। খবরে বলা হচ্ছে, জাহাজ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার একাধিক চেষ্টাও হয়েছে।
৩৭ বছর বয়সী এই পারমাণবিক চালিত বিমানবাহী জাহাজটি নয় মাস ধরে সমুদ্রে অবস্থান করছে, যার মধ্যে গত পাঁচ মাস ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় নিয়োজিত রয়েছে। সামরিক বিষয়ক একাধিক প্রকাশনা এবং কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য জাহাজটির অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
গত ২১ নভেম্বর যাত্রা শুরুর সময় নির্ধারিত ছিল জাহাজটির মোতায়েন মে মাসে শেষ হবে। তবে জাহাজে থাকা প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিনদের জন্য সেই সময়সীমা বারবার বাড়ানো হয়েছে, এবং এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সমাপ্তির তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি মাইক লেভিন বলেছেন, জাহাজে থাকা সদস্যরা অমানবিক শারীরিক অবস্থার শিকার হচ্ছেন। অপরদিকে কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেসন ক্রো সতর্ক করে বলেছেন, সদস্য এবং তাদের পরিবারের ওপর মানসিক চাপ দিন দিন বাড়ছে।
স্বাধীন সংবাদমাধ্যম নেভি টাইমস জানিয়েছে, জাহাজ থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করেছে একাধিক সদস্য। আরেক স্বাধীন প্রকাশনা স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসও জাহাজে আত্মহত্যার চেষ্টা ঠেকানোর খবর প্রকাশ করেছে। এক স্ত্রী স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসকে জানান, তার স্বামী তাকে মেসেজে লিখেছেন যে তিনি আশা করছেন আগামীকাল ঘুম থেকে না উঠতে হয়। অপর এক অভিভাবক জানান, তার নাবিক ছেলে বলেছে যে স্বস্তি পাওয়ার জন্য সে এবং তার সহকর্মীরা বারবার জাহাজ থেকে লাফ দেওয়ার কথা ভাবে।
গত ২১ নভেম্বরের পর থেকে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ক্রুরা মাত্র দুই দিন মাত্র স্থলভাগে পা রেখেছেন। ডিসেম্বরে গুয়ামে একটি দিন, যেখানে অনেক নাবিককে জাহাজ থেকে নামতে দেওয়া হয়নি; এবং জুলাই মাসে ওমানে সরবরাহ নেওয়ার সময়, যেখানে জাহাজ থেকে নামতে পারা নাবিকদের বন্দরের ভেতরে একটি নিরাপদ এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল।
জাহাজে রেশনকৃত খাবার এবং ভাঙা সুবিধাসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা জনসমক্ষে এসেছে। তবে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এই অভিযোগগুলোকে 'আরও বেশি ভুয়া খবর' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ফোর্বস মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করেছে।
জাহাজের জীবনযাত্রার বর্ণনা দিয়ে লেভিন বলেন, ছাঁচে ধরা শাওয়ার, ভাঙা টয়লেট, সপ্তাহের পর সপ্তাহ বন্ধ থাকা লন্ড্রি, দীর্ঘ সময় গরম পানি নেই, অর্ধেক কাপ ভাত আর দুটি টর্টিলায় সীমিত খাবার। সাবান, ডিওডোরেন্ট বা টুথপেস্টও নেই।
সমুদ্রে একটি মোবাইল এয়ার বেস হিসেবে কাজ করা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত ২১ নভেম্বর সান দিয়েগোর নিজ বন্দর ত্যাগ করে রুটিন প্যাসিফিক মোতায়েনের উদ্দেশ্যে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলার আগে জানুয়ারিতে জাহাজটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয় এবং তারপর থেকে এটি আরব সাগরে অবস্থান করছে। কর্মকর্তারা পরিবারগুলোকে জানাতে পারছেন না কবে লিংকন দেশে ফিরবে। স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস জানিয়েছে, মোতায়েন শেষ কবে হবে তার অনিশ্চয়তা সদস্যদের ওপর 'গুরুতর প্রভাব' ফেলতে পারে। নৌবাহিনীর সারফেস ফোর্সের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল জোসেফ ক্যাহিল সম্প্রতি সান দিয়েগোতে এক সভায় পরিবারগুলোকে বলেছেন, দীর্ঘায়িত মোতায়েনের প্রভাব সম্পর্কে তিনি তাদের কথা 'স্পষ্টভাবে শুনেছেন' এবং জানিয়েছেন জাহাজে ডিপ্লয়মেন্ট-রেজিলিয়েন্স কাউন্সেলর এবং চ্যাপলিন রয়েছেন।
ছয় মাস সময়কাল ছিল নৌবাহিনীর ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপগুলোর জন্য আধুনিক মানদণ্ড। কিন্তু পর্যাপ্ত সংখ্যক জাহাজ না থাকা এবং অনেক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের কারণে মোতায়েনের মেয়াদ দিন দিন বাড়ছে। সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে উন্নত বিমানবাহী জাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড আধুনিক যুগের রেকর্ড ৩২৬ দিন সমুদ্রে কাটিয়ে গত মে মাসে তার মোতায়েন শেষ করে।




