ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ম্যাচ শুধু ক্রীড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ফকল্যান্ড যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আরও একবার সবার নজরে এসেছেন আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিয়ারুয়েল। ম্যাচ শুরুর আগে তিনি ইংল্যান্ডকে ‘দখলদার পাইরেট’ আখ্যা দিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন, যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

ভিক্টোরিয়া ভিয়ারুয়েল একজন আইনজীবী, লেখক ও রাজনীতিবিদ। ২০২৩ সালে হাভিয়ের মিলেইর সঙ্গে জোট বেঁধে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তাঁর জন্ম এক সামরিক পরিবারে; বাবা এদুয়ার্দো ভিয়ারুয়েল ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পরিবারের এই ঐতিহ্যই তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি সেন্টার ফর লিগ্যাল স্টাডিজ অন টেররিজম অ্যান্ড ইটস ভিকটিমস (সেলটিভি) প্রতিষ্ঠা করেন, যা বামপন্থী গেরিলা সহিংসতার শিকারদের পক্ষে কাজ করে। ২০২১ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২৩ সালে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ফুটবলকে কেন্দ্র করে তাঁর জাতীয়তাবাদী বক্তব্য নতুন নয়। সেমিফাইনালের আগে ইংল্যান্ডবিরোধী মন্তব্য করে তিনি আবারও শিরোনামে উঠে আসেন। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনা দলের ফকল্যান্ডবিরোধী ব্যানার প্রদর্শনের ছবি নিজের ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করে তিনি কড়া বার্তা দেন। ফিফার নিয়ম ভেঙে এই ব্যানার প্রদর্শন করা হয়েছিল বলেও জানা যায়।

ব্যক্তিগত জীবনে ভিয়ারুয়েল অত্যন্ত গোপনীয়। তিনি একজন অনুশীলনকারী ক্যাথলিক খ্রিষ্টান এবং নিয়মিত লাতিন মিসায় অংশ নেন। প্রায় ২০ বছর বয়সে প্রথম বিবাহের পর ২০০৮ সালে তা ভেঙে যায়। পরে ক্যাথলিক চার্চ সেই বিয়ে বাতিল ঘোষণা করে। দ্বিতীয় বিয়ে তিনি করেন প্রকৌশলী ও ওয়াইন প্রস্তুতকারক সেবাস্তিয়ান বাজসেতিচের সঙ্গে। তাঁদের কোনো সন্তান নেই; ভিয়ারুয়েল একাধিকবার বলেছেন, কর্মজীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে ভাবায়।

ভিয়ারুয়েলের ফ্যাশন স্টাইলকে ‘ফার্স্ট লেডি অ্যাসথেটিক’ বলা হয়। তিনি টেইলর্ড ড্রেস বা স্যুট, প্যাস্টেল শেড, নেভি ব্লু, ধূসর ও কালো রঙের পোশাক পছন্দ করেন। মিনিমাল গয়না ও বাহুল্যহীন লম্বা কালো চুলে তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সফরের সময় তিনি ঐতিহ্যবাহী পঞ্চো ও স্থানীয় কাপড় ব্যবহার করেন।

খাদ্যাভ্যাসে তিনি আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্রিওয়ো খাবার—বিশেষ করে বিফ আসাদো, এম্পানাদা ও বিভিন্ন আঞ্চলিক খাবারের প্রতি আগ্রহী। ওয়াইন প্রস্তুতকারক স্বামীর কারণে আর্জেন্টিনার উন্নতমানের ওয়াইনের প্রতিও তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিনের জীবনে তিনি নিয়মিত মাতে পান করেন; এমনকি ব্যস্ত সংসদীয় কাজের সময়ও নিজের মাতে সেট সঙ্গে রাখেন।

তাঁর সামাজিক পরিসর মূলত রক্ষণশীল সামরিক পরিবার, ইতিহাসবিদ এবং ধর্মীয় পরিচিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অবসর সময়ে তিনি ইতিহাস গবেষণা, সামরিক নথি পড়া এবং বই লেখায় ব্যয় করেন। নিজের ব্যক্তিগত জীবন—বাসস্থান, দৈনন্দিন রুটিন বা শখ—সম্পর্কে তিনি খুব কম তথ্যই প্রকাশ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি তাঁর সচেতন জন-ভাবমূর্তি গড়ে তোলার অংশ।

ভিয়ারুয়েলের বিতর্কিত পারিবারিক অধ্যায়ের কথাও জানা যায়। তাঁর এক চাচা সামরিক শাসনামলে গোপন আটককেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে ২০১৫ সালে গ্রেপ্তার হন, তবে এ বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেন না। তাঁর বাবা ফকল্যান্ড যুদ্ধে অংশ নেওয়া একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং নানা ছিলেন নৌবাহিনীর ইতিহাসবিদ। এই সামরিক ঐতিহ্যই তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি তৈরি করেছে।