সুদানের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) সরবরাহ নেটওয়ার্কে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের এক সাবেক সদস্যের বিরুদ্ধে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি বিস্তৃত অনুসন্ধানে এই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৬৩ বছর বয়সী স্টিভেন শলিস নামের ওই সাবেক সেনা সদস্যের নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অন্তত তিনটি পুরোনো বোয়িং উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে, যেগুলো আরএসএফের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত আফ্রিকার বিভিন্ন বিমানবন্দরে যাতায়াত করেছে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম চাদ, লিবিয়া ও সোমালিয়ার কয়েকটি বিমানবন্দরে কেন্দ্রীভূত। রয়টার্সের হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, শলিস-সংশ্লিষ্ট বিমানগুলো অন্তত ১৬ বার সোমালিয়ার বোসাসো, লিবিয়ার কুফরা এবং দারফুরের নিয়ালায় অবতরণ করেছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিমানবন্দরগুলো আরএসএফের সরবরাহ নেটওয়ার্কের মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিমানগুলো চাদের রাজধানী এন’জামেনার বিমানবন্দরের সামরিক অংশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছিল, যেখানে প্রবেশাধিকার দেশটির সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।

২০২৫ সালের মে মাসে দারফুরের নিয়ালা বিমানবন্দরে একটি বোয়িং ৭৩৭ মডেলের উড়োজাহাজ ধ্বংসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই অনুসন্ধান শুরু হয়। সুদানের সেনাবাহিনীর হামলায় ওই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়, যাতে ৫৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৫১ জনই আরএসএফের যোদ্ধা ছিলেন। ধ্বংস হওয়া ওই উড়োজাহাজের পাইলট ও গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার শলিসের মালিকানাধীন সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক অক্সিডেন্টাল সাপোর্ট সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছিলেন বলে জানা গেছে।

রয়টার্স পরবর্তী সময়ে আরও দুটি বোয়িং ৭২৭ উড়োজাহাজ শনাক্ত করে, যেগুলো শলিস-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এসব বিমান যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল থেকে আফ্রিকায় নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটি বিমান ব্রাজিল থেকে প্রায় ১০ লাখ ডলারে কেনা হয় এবং পরে চাদে নিয়ে যাওয়া হয়। স্যাটেলাইট ছবিতে সেটিকে একাধিকবার লিবিয়ার কুফরা বিমানবন্দরে দেখা গেছে। এসব উড়োজাহাজে কী পরিবহন করা হতো বা কারা অর্থ জোগাত, রয়টার্স তা নিশ্চিত করতে পারেনি। শলিস এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রশ্নের জবাব দেননি।

অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক কন্ট্র্যাক্টর এয়ারওয়েজের পরিচালক ও শলিসের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সহযোগী ক্রেইগ মনরো রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরএসএফের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর দাবি, উড়োজাহাজগুলো চিকিৎসাসামগ্রী বহনের মতো স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।

শলিস বর্তমানে সিঙ্গাপুরভিত্তিক সেন্ট্রাল এশিয়া ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের (সিএডিজি) প্রধান। গত দুই দশকে তাঁর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও জাতিসংঘের কাছ থেকে সামরিক ও উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তত ৪১ কোটি ৯০ লাখ ডলারের কাজ পেয়েছে। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের অবকাঠামো নির্মাণ, ইরাকে সরঞ্জাম সরবরাহ এবং কেনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের বিমানঘাঁটির কাজও করেছে তাঁর প্রতিষ্ঠান। তবে শলিস বা তাঁর কোনো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে কিংবা তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফান ডুজারিক রয়টার্সকে বলেন, সিএডিজি অতীতে জাতিসংঘের কিছু কাজ করেছিল। তবে সুদানে এই উড়োজাহাজগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে জাতিসংঘ অবগত নয় এবং সুদানে বর্তমানে সংস্থাটির কোনো কাজ নেই।

সুদানের যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও মার্কিন আইনপ্রণেতারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে আরএসএফকে অস্ত্র ও ভাড়াটে যোদ্ধা দিয়ে সহায়তা করার অভিযোগ তুলেছেন। আমিরাত এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, সুদানে তাদের ভূমিকা মানবিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে সুদানের সেনাবাহিনী মিসর, তুরস্ক, সৌদি আরব ও কাতারের রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন পেয়েছে।

রয়টার্সের এই অনুসন্ধান বলছে, সুদানের গৃহযুধ শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ কোনো সংঘাত নয়; বরং এর সরবরাহ নেটওয়ার্কে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, আঞ্চলিক শক্তি ও জটিল বিমানপথের সম্পৃক্ততা রয়েছে। সেই নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল রহস্যময় কয়েকটি পুরোনো বোয়িং উড়োজাহাজ।