ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর আগে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মহারাষ্ট্রের প্রবীণ রাজনীতিবিদ শারদ পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন এনসিপি (শারদপন্থী) লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস ও নারী সংরক্ষণ সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধন বিলে সমর্থন দেওয়ার কথা ভাবছে। শারদ-কন্যা সুপ্রিয়া সুলে জানিয়েছেন, যদি বিলে প্রতি রাজ্যের আসন সংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, তবে ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে তাঁরা সমর্থন দিতে পারেন। এই অবস্থান ইন্ডিয়া জোটের ঐক্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
এর আগে আম আদমি পার্টি (আপ), তৃণমূল কংগ্রেস ও উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনায় ভাঙন ধরিয়েছে বিজেপি। রাজ্যসভায় আপের ১০ সদস্যের মধ্যে ৭ জন বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের লোকসভার ২৮ সদস্যের মধ্যে ২০ জনকে সরাসরি বিজেপিতে না এনে একটি নতুন দল ‘ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই) গঠন করে সেখানে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এই দল বিজেপিকে সমর্থন জানিয়েছে। অন্যদিকে, উদ্ধবপন্থী শিবসেনার ৯ জন সাংসদের মধ্যে ৬ জন শিন্ডে সেনায় চলে গেছেন। এখন লক্ষ্য শারদ পাওয়ারের দল।
বিজেপি বর্ষাকালীন অধিবেশনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করাতে চায়। প্রথমটি হলো নারী সংরক্ষণ ও আসন বৃদ্ধি বিল, যাতে এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত করার পাশাপাশি লোকসভার মোট আসন বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। দ্বিতীয়টি ‘এক দেশ, এক ভোট’ বিল, যা লোকসভা ও বিধানসভার নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজনের ব্যবস্থা করবে। সংবিধান সংশোধন বিল পাস করতে লোকসভা ও রাজ্যসভায় উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। বাজেট অধিবেশনে এই বিল পরাস্ত হয়েছিল এনডিএর সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায়। তবে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি বদলে গেছে।
বর্তমান লোকসভায় মোট আসন ৫৪৩, যার মধ্যে তিনটি শূন্য। বাজেট অধিবেশনে নারী বিলের পক্ষে ২৯৮ ও বিপক্ষে ২৩০ ভোট পড়েছিল। দুই-তৃতীয়াংশের জন্য প্রয়োজন ৩৬০ ভোট (সব সদস্য উপস্থিত থাকলে)। এপ্রিলে উপস্থিত ছিলেন ৫২৮ জন, ফলে দরকার ছিল ৩৫২ ভোট। বর্তমানে এনডিএর শক্তি বেড়ে ৩১৯ হয়েছে। শারদপন্থী এনসিপির ৮ জন সাংসদ সমর্থন দিলে সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২৭। এখনও প্রয়োজনীয় সংখ্যা থেকে ৩৩টি কম। এই ঘাটতি পূরণ হতে পারে ডিএমকে (২২ জন) ও সমাজবাদী পার্টির (৩৭ জন) মাধ্যমে। বিজেপি তামিলনাড়ুর নির্বাচনের পর ডিএমকে’র মন জয়ে চেষ্টা করছে, পাশাপাশি সমাজবাদী পার্টিতেও ভাঙন ধরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উত্তরপ্রদেশে আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচন, তাই দলটি বিজেপির চাপে থাকতে পারে। যদি ডিএমকে ও সমাজবাদী পার্টি ভোটের দিন অনুপস্থিত থাকে বা ওয়াক আউট করে, তবে লোকসভায় ভোটদাতা সদস্য সংখ্যা কমে ৪৮৪ হবে, যার দুই-তৃতীয়াংশ ৩২৪। সেক্ষেত্রে শারদপন্থীদের সমর্থন পেলে এনডিএর পক্ষে ৩২৭ ভোট পাওয়া সম্ভব।
রাজ্যসভায় পরিস্থিতি আরও জটিল। উচ্চকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশের জন্য প্রয়োজন ১৬৪ ভোট। বর্তমানে সব সদস্য উপস্থিত থাকলে এনডিএ পায় ১৫৫ ভোট। শারদপন্থী এক সদস্য সমর্থন দিলে সংখ্যা হয় ১৫৬। এখনও ৮ ভোট কম। বিজেপি ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার (জেএমএম) তিন সদস্য এবং অন্যান্য ছোট দলের কাছ থেকে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সঙ্গে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিরোধী জোটের নেতারা অভিযোগ করছেন, বিজেপি ইডি, সিবিআই ও আয়কর বিভাগকে ব্যবহার করে দল ভাঙাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তারা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বিধায়ক মদন মিত্রের দলত্যাগের কথা উল্লেখ করেছেন। তার স্ত্রী ও দুই ছেলেকে ইডি তলব করার পরই তিনি বিদ্রোহী তৃণমূলে যোগ দেন। বিজেপির এক শীর্ষ নেতা বলেছেন, ‘এবার আমরা হারার জন্য বিল আনব না।’ ইন্ডিয়া জোটের শঙ্কা, এই কৌশল অব্যাহত থাকলে বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিজেপি তাদের পছন্দের বিল পাস করিয়ে নিতে সক্ষম হবে।



