দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার চিন্তাভাবনা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের জন্য অপেক্ষা না করে আগামী আগস্ট মাসের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যেই এই নির্বাচন সেরে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। উচ্চপর্যায়ের একটি সরকারি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কিছু ঘোষণা করা হয়নি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নীতি-নির্ধারক মহলে বর্তমানে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। যদিও প্রথমদিকে একাধিক নাম শোনা গিয়েছিল, ধীরে ধীরে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সামনে চলে এসেছে। দলের ভেতরে ও বাইরে তাকে ঘিরেই এখন সব ধরনের কথাবার্তা কেন্দ্রীভূত। উল্লেখ্য, এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটি এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক ফয়সালায় পৌঁছায়নি।
গত শনিবার বগুড়ায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল নিজে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি পদের জন্য দলীয় কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, নাকি বাইরের কাউকে আনা হবে, সেটা সংবিধান ও প্রচলিত আইনের আওতায় দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের মাধ্যমেই চূড়ান্ত হবে। প্রসঙ্গত, গত ২৪ জুলাই শুক্রবার বিকেলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
প্রথম দিকে সরকার সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর বক্তব্য ছিল, সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। কিন্তু, একটি বিশেষ সংসদ অধিবেশন ডাকা যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য বাধ্যতামূলক কোনো শর্ত নয়, সেটিও আইনের ভাষায় পরিষ্কার। সংসদ চলমান না থাকলেও ভিন্ন পদ্ধতিতে এ নির্বাচন অনুষ্ঠান করানো সম্ভব। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের কাছে শনিবার একথা স্বীকার করে বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য আলাদা কোনো অধিবেশনের দরকার পড়বে না। সংসদের আগের অধিবেশন শেষ হয়েছিল ১৫ জুলাই। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হল ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন বসানো। আইনমন্ত্রীর পূর্বে আশা ছিল, ওই নির্ধারিত অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কাজ সারা হবে।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ফলে সংবিধান অনুসারে ৯০ দিনের ভিতরে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সমাপ্ত করা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু জাতীয় সংসদে বিএনপির একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে, তাই দলটির মোননীত প্রার্থীর বিজয় লাভের সম্ভাবনাই সর্বাধিক। দলীয় একাধিক সূত্রের মতে, মির্জা ফখরুলের পক্ষে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কাজ করছে। টানা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে দলের ঐক্য অটুট রাখা, নিজের স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ইমেজ এবং নিজ দলের বাইরেও তার বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতা—এগুলো তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি বেছে নেওয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করছে না সরকার, কোন নাম বেশি আলোচনায় তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, রাষ্ট্রপতি পদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমনের অভিমত জরুরি হলেও বিষয়টি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী কমিটির আলোচনার মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিক রূপ পাবে। দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা এখনও সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলতে আগ্রহী নন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের মত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রকাশভঙ্গে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে মতামত দিয়েছেন।
তবে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি রূপে দায়িত্ব নিলে সরকার ও দলে কয়েকটি বড় রদবদল আসবে। সেক্ষেত্রে তাকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদটি ছেড়ে দিতে হবে। সেই সাথে শূন্য হবে বিএনপির মহাসচিবের পদও, যেখানে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হবে। সাংবিধানিক নিয়ম মেনে তার নির্বাচনী আসন ঠাকুরগাঁও-১ থেকেও তাকে ইস্তফা দিতে হবে, যার ফলে ওই এলাকায় উপনির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনও (ইসি) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। ইসি কর্তৃপক্ষ জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের সাথে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা সারেছে। গতকাল সংসদ ভবনে বৈঠকের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন জানিয়েছেন, এই নির্বাচন সম্পন্ন করতে কমিশন সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনের ধারা অনুযায়ী, স্পিকারের সাথে পরামর্শ করেই দিন-তারিখ ঠিক করা হবে। তবে সুনির্দিষ্ট কোন দিন এখনও স্থির হয়নি। সংসদ সদস্যদের হালনাগাদ ভোটার তালিকা হাতে পেলেই তফসিল জারি করা হবে। নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী অংশ নিলে সংসদ ভবনে প্রকাশ্য ব্যালটের ব্যবস্থা করা হবে, আর যদি একজনই বৈধ প্রার্থী থাকেন, তাহলে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষণা দেবে কমিশন।




