গিবত বা পরনিন্দা সামাজিক মেলামেশার নীরব কিন্তু গভীর পাপগুলোর অন্যতম। চায়ের টেবিল, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় আমরা প্রায়ই অনুপস্থিত ব্যক্তির দোষত্রুটি নিয়ে হাস্যরস করি। আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ বিনোদন মনে হলেও ইসলামি জীবনদর্শনে একে জঘন্য অপরাধ ও আত্মিক ব্যাধি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে গিবতকে নিজের মৃত ভাইয়ের কাঁচা গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করে এর বীভৎসতা বোঝানো হয়েছে। নবীজির (সা.) বাণীতেও এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা স্পষ্ট। তিনি বলেন, যারা শুধু মুখে ইমান এনেছেন কিন্তু অন্তর পর্যন্ত বিশ্বাস পৌঁছায়নি, তারা যেন মুসলমানদের গিবত না করেন এবং তাদের গোপন দোষ খুঁজে বের না করেন। কারণ, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দোষ সন্ধানে ব্যস্ত থাকে, আল্লাহ তার নিজের দোষ প্রকাশ করেন; এমনকি ঘরের ভেতরেও তাকে অপমানিত হতে হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৮০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)
ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনে কুদামা আল-মাকদিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী গিবতের পরিধি শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়। কারো অনুপস্থিতিতে তার শারীরিক গঠন, বংশ পরিচয়, নৈতিক চরিত্র বা পোশাকের খামতি নিয়ে কটূক্তি করা, ইশারা-ইঙ্গিত বা অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যঙ্গ করা, এমনকি লিখে চরিত্রহনন করাও গিবতের অন্তর্ভুক্ত। পাশে বসে অন্যের গিবত উপভোগ করা বা নীরব সমর্থন জানানোও এই পাপে শরিক হওয়ার সমতুল্য। তাফসিরবিদরা বলেন, গিবত শোনার সময় মুখে প্রতিবাদ জানানো উচিত; তা সম্ভব না হলে অন্তত অন্তরে ঘৃণা প্রকাশ করে সেই স্থান ত্যাগ করতে হবে।
অনেকে মনে করেন সত্য কথা বললে বুঝি গিবত হয় না। কিন্তু নবীজির (সা.) কাছে সাহাবিরা যখন জিজ্ঞাসা করলেন গিবত কী, তিনি বললেন — তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কোনো কথা বলা যা সে অপছন্দ করে। পুনরায় প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট করেন: যা বলছ তা যদি তার মধ্যে সত্যিই থাকে, তবে তুমি তার গিবত করলে; আর যদি মিথ্যা হয়, তবে তা অপবাদ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)
মানুষ কেন গিবত করে? এর পেছনে কয়েকটি মৌলিক দুর্বলতা কাজ করে। প্রথমত, কারো ওপর রাগ বা প্রতিশোধের আগুন মেটাতে অপপ্রচার চালানো হয়। দ্বিতীয়ত, বন্ধুদের সঙ্গে তাল মেলাতে বা হাসির খোরাক জোগাতে অন্যের চরিত্র নিয়ে রসিকতা করা হয়। তৃতীয়ত, অন্যকে বোকা, সংকীর্ণমনা বা অজ্ঞ প্রমাণ করে পরোক্ষভাবে নিজের জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার অসুস্থ প্রবণতা। চতুর্থত, অন্যের সফলতা বা সম্মান দেখে হিংসাগ্রস্ত হয়ে তার ভুলত্রুটি সবার সামনে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।
এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তির কার্যকরী উপায় হলো পরকালের ভয়াবহ পরিণাম মনে রাখা। কেয়ামতের দিনে কোনো বান্দা যখন তার ইবাদত নিয়ে উঠবে, তখন গিবতের কাফফারা হিসেবে তার ভালো কাজগুলো নির্যাতিত ব্যক্তিকে দিয়ে দেওয়া হবে। যদি সওয়াব শেষ হয়ে যায়, তবে ওই ব্যক্তির পাপের বোঝা গিবতকারীর ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে দোজখে ফেলা হবে। নবীজি (সা.) এই ব্যক্তিকে পরকালের প্রকৃত ‘দেউলিয়া’ বা নিঃস্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যে দুনিয়ায় নামাজ-রোজা করেও অন্যের সম্মানহানি করে পরকালে সব সওয়াব হারিয়ে বসে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯)
যখনই কারো গিবত করার ইচ্ছা জাগবে, তখন নিজের ভেতরের অজস্র দোষত্রুটির কথা চিন্তা করা উচিত। যে মানুষ নিজের ভুল শুধরাতে ব্যস্ত থাকে, অন্যের পেছনে সময় দেওয়ার সুযোগ তার থাকে না। আর যদি কেউ মনে করে তার কোনো দোষ নেই, তবে তার উচিত মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা — যাতে তিনি তাকে পবিত্র রেখেছেন এবং গিবতের মতো নিকৃষ্টতম পাপে নিজের হাত-মুখ ময়লা করা থেকে রক্ষা পেয়েছেন।
ইসলাম অন্যের গোপন দোষ অনুসন্ধান করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। তবে কিছু বিশেষ জনকল্যাণমূলক ও আইনি পরিস্থিতিতে কারো সত্য দোষ বা অন্যায়ের কথা প্রকাশ করা গিবত হিসেবে গণ্য হয় না, বরং অনুমোদিত। যেমন — অত্যাচারিত ব্যক্তি বিচারক বা কর্তৃপক্ষের কাছে অত্যাচারীর বর্ণনা দেওয়া; সমাজে ছড়িয়ে পড়া অপরাধ থামাতে প্রভাবশালী কাউকে সত্য ঘটনা জানানো; ফতোয়া ও আইনি পরামর্শের জন্য মুফতি বা বিচারকের কাছে নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ দেওয়া; বিবাহ, ব্যবসায়িক চুক্তি, আমানত বা কোনো পাপিষ্ঠ ব্যক্তির সান্নিধ্য থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষার জন্য সত্য তথ্য প্রকাশ করা। এছাড়া পরিচিতির জন্য হেয় করার নিয়ত ছাড়া বিশেষ উপাধি ব্যবহার করা এবং প্রকাশ্যে নির্লজ্জ পাপাচারকারীর অন্যায় নিয়ে আলোচনা করাও ব্যতিক্রমের অন্তর্ভুক্ত।
গিবত একটি দ্বিমুখী পাপ — এতে একই সঙ্গে আল্লাহর বিধান অমান্য হয় এবং বান্দার হকের ওপর আঘাত হানা হয়। তাই শুধু আস্তাগফিরুল্লাহ পড়লেই গুনাহ মাফ হয় না। যদি যে ব্যক্তির গিবত করা হয়েছে তিনি বিষয়টি জেনে থাকেন, তবে সরাসরি তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে মন পরিষ্কার করে নিতে হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯) আর যদি তিনি একেবারেই না জেনে থাকেন, তবে তাকে জানিয়ে নতুন করে সম্পর্কের ক্ষতি না করে, তার জন্য বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে, গোপনে তার প্রশংসা করতে হবে এবং তার কল্যাণ কামনা করে দোয়া করতে হবে। (ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, মুখতাসার মিনহাজুল কাসিদিন, পৃষ্ঠা ১৮৬-১৯১)
পরনিন্দা থেকে বাঁচার জন্য সহজ অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে — নিজের দোষ নিয়ে ব্যস্ত থাকা, পরকালের শাস্তির ভয় মনে রাখা, অন্যের জন্য গোপনে প্রশংসা ও দোয়া করা। এই চর্চাগুলো নীরব সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি দিয়ে আত্মিক শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।




