পশ্চিম ইউরোপে দাবানল ও তাপপ্রবাহের মধ্যেই ইউরোপের বৃহত্তম নদীগুলোর একটি ড্যানিউবের পানির স্তর ঐতিহাসিক নিম্নতায় পৌঁছেছে। জার্মানি থেকে কৃষ্ণ সাগর পর্যন্ত দশটি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটির বিস্তীর্ণ অংশে পাথর, বালুচর এবং পুরনো জাহাজের ধ্বংসাবশেষ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। বুধবার সকালে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে জাতীয় পানি কর্তৃপক্ষ ড্যানিউবের জলস্তর মাত্র ২৩ সেন্টিমিটার (৯ ইঞ্চি) রেকর্ড করে, যা ২০১৮ সালে নির্ধারিত ৩৩ সেন্টিমিটার (১৩ ইঞ্চি) আগের সর্বনিম্ন রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। আগামী দিনগুলোতে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় এবং উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা না থাকায় নদীর জলস্তর আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মধ্য ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চল বছরের বেশিরভাগ সময় ধরে খরার কবলে রয়েছে এবং একের পর এক তাপপ্রবাহ বাষ্পীভবন ত্বরান্বিত করেছে। হাঙ্গেরিয়ান আবহাওয়া সেবা বিভাগের তথ্যমতে, দেশটির প্রায় পুরো এলাকায় বহু বছরের গড়ের তুলনায় ৯০ দিনের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৮০ থেকে ১৩০ মিলিমিটার (৩.১ থেকে ৫.১ ইঞ্চি) কম। নিম্ন জলস্তরের কারণে বুদাপেস্টে দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের জন্য পর্যটকরা যে ক্রুজ জাহাজে উঠতেন, সেগুলো নদীর উজানে অনেক দূরে নোঙর করতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে, হাঙ্গেরির পরিবহন ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়ের মতে, পণ্যবাহী জাহাজের চলাচল প্রায় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে।

বুলগেরিয়ায়, যেখানে ড্যানিউড রোমানিয়ার সাথে সীমান্ত তৈরি করেছে, পুলিশ মঙ্গলবার বিদিন বন্দর শহরের কাছে আটকে পড়া একটি ক্রুজ জাহাজ থেকে ১৮৬ জন পর্যটককে উদ্ধার করে। বুলগেরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বিটিএ জানিয়েছে, ভাইকিং উলুর নামের জাহাজটির খাবার ও পানি ফুরিয়ে গিয়েছিল, কারণ এটি অগভীর চরে আটকে পড়ায় বিদিন বন্দরে পৌঁছাতে পারেনি। পুলিশ জানিয়েছে, জাহাজটির ৫২ জন ক্রু সদস্যকে নেভিগেশন অবস্থা ও জাহাজ ভাসানোর বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে আরও দীর্ঘ সময় জাহাজে থাকতে হতে পারে। সার্বিয়ায়, উত্তরাঞ্চলীয় শহর নোভি সাদের কাছে শুকনো নদীতীরে শতাধিক ছোট নৌকা ও কয়েক ডজন পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়েছে। নদী ভ্রমণ পরিচালনাকারী একটি হাউস বোটের মালিক রাডোভান সেগার্ট বার্তা সংস্থা এপিকে জানিয়েছেন, ড্যানিউবের পানি তীর থেকে ১৫ থেকে ২০ মিটার (৫০ থেকে ৬৫ ফুট) সরে গেছে। তিনি বলেন, ‘গ্রীষ্মকালীন মৌসুম এখন শেষ, যতদূর নৌকা চালানোর বিষয়।’

নিম্নগামী পানি প্রবাহ পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকেও প্রভাবিত করছে। রোমানিয়ায় ড্যানিউবের জলপ্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে ১,৬৩০ ঘনমিটারে নেমে এসেছিল, যা জুলাই মাসের গড়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। নিরাপত্তার কারণে মঙ্গলবার সার্নাভোদা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি চুল্লি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং আরেকটি চুল্লি শীঘ্রই বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। অন্যদিকে, হাঙ্গেরির পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা দেশটির প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, শীতলীকরণ পানি সীমিত হওয়ায় বুধবার একটি চুল্লি বন্ধ করতে শুরু করে। এর আগে গত দুই দিনে দুইটি চুল্লির বিদ্যুৎ উৎপাদন ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা হয়েছিল।

শুকিয়ে যাওয়া নদীর তলদেশ বিপদও ডেকে আনছে। গত সপ্তাহে বুদাপেস্ট কর্তৃপক্ষ মার্গারেট ব্রিজ বন্ধ করে দেয়, কারণ কমে যাওয়া পানির স্তরে সেতুর গোড়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি বোমা উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। ধন সন্ধানী জোল্ট হোরভাথ মঙ্গলবার একটি শক্তিশালী চুম্বক দিয়ে উন্মুক্ত নদী তীর থেকে ধাতব জিনিস সংগ্রহের কাজ করছিলেন। তিনি বলেন, পুরনো রেডিও অ্যামপ্লিফায়ার বা বিশ্বযুদ্ধের বুলেটের খোলসের মতো জিনিস খুঁজে পেয়ে তিনি প্রচুর আনন্দ পান। তবে তিনি মন্তব্য করেন, ‘ড্যানিউবে এত কম পানি থাকা এই ধরনের কার্যকলাপের জন্য আশীর্বাদ হলেও, অন্যথায় এটি একটি অভিশাপ।’