ভাগ্য বা তকদিরের ধারণা নিয়ে মানুষের চিন্তা-ভাবনা বহুদিনের। জীবনের প্রতিটি ঘটনা কি পূর্বনির্ধারিত, নাকি মানুষ তার নিজের সিদ্ধান্ত ও কাজের ব্যাপারে স্বাধীন? যদি সবকিছু আগে থেকেই স্থির থাকে, তাহলে ভালো বা মন্দ কাজের জন্য মানুষকে কেন দায়ী করা হবে? ভাগ্যে বিশ্বাস কি মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে তোলে, নাকি তা তাকে নিশ্চিন্ত মনে কাজ করতে উৎসাহ দেয়? ইসলামি দর্শনে এই বিষয়টি ততটা জটিল বা হতাশাজনক নয় যতটা মনে হতে পারে। মুসলিম পণ্ডিতরা দেখিয়েছেন যে মূল সমস্যা ভাগ্যে বিশ্বাস করা নয়; বরং আল্লাহর সার্বিক জ্ঞান এবং মানুষের নৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সম্পর্ক বোঝার অক্ষমতা। তকদিরকে দায়িত্ব এড়ানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা, অথবা মানুষকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ভেবে আল্লাহর সর্বব্যাপী ইচ্ছাকে অস্বীকার করা—এই দুটোই বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে। যে কাজের ওপর বেহেশতের পুরস্কার বা জাহান্নামের শাস্তি নির্ভর করে, তা কখনোই জোর করে করা যায় না; এটি হতে হবে মানুষের নিজস্ব ইচ্ছায়।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, “আমি জিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ৫৬) এই আয়াতের অর্থ এই নয় যে মানুষকে জোর করে ইবাদত করতে বাধ্য করা হয়েছে। কারণ, যে কাজের উপর পুরস্কার বা শাস্তি নির্ভর করে, তা জোর করে করানো সম্ভব নয়। আলী (রা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “আয়াতের মূল বক্তব্য হলো, ‘আমি মানুষকে আমার ইবাদতের নির্দেশ দিতে এবং সেদিকে আহ্বান জানাতেই সৃষ্টি করেছি।’” (আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল-সালাবি, আল-কাশফু ওয়াল বায়ান আন তাফসিরিল কোরআন, ৯/১১২)। মানুষকে ফেরেশতাদের মতো বাধ্যগত আনুগত্যের জন্য সৃষ্টি করা হয়নি, বরং তাকে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যেখানে তার কাজের ভালো-মন্দ নির্ধারণের জন্য তাকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

ইসলামি দর্শনে আল্লাহর ইচ্ছাকে দুটি ভাগে দেখা হয়। প্রথমটি হলো বিশ্বজগতের প্রাকৃতিক নিয়ম, যেখানে মানুষের কোনো হাত নেই। যেমন, মানুষ কখন ও কোথায় জন্ম নেবে, তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য কী হবে, সে কখন অসুস্থ হবে বা মারা যাবে—এগুলো সম্পূর্ণ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। দ্বিতীয়টি হলো জীবনযাপনের নৈতিক নিয়ম বা শরিয়ত। এই ক্ষেত্রে মানুষকে ভালো ও মন্দ বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মানুষ নিজের ইচ্ছায় ভালো কাজ করতে পারে, আবার মন্দ পথও বেছে নিতে পারে। মানুষ নির্জীব বস্তু বা পশুপাখির মতো নয়; তার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার মধ্যে নিহিত। এই স্বাধীনতার কারণেই মানুষ তার কাজের জন্য প্রশংসিত বা নিন্দিত হয় এবং পরকালে পুরস্কার বা শাস্তি পায়।

অনেকের প্রশ্ন, আল্লাহ যদি আগে থেকেই জানেন আমি ভবিষ্যতে কী করব, তাহলে আমার কিছু করার নেই। এর উত্তর হলো, কোনো কিছু ‘আগে থেকে জানা’ আর কাউকে ‘সেই কাজ করতে বাধ্য করা’—এক জিনিস নয়। আল্লাহ জানেন মানুষ নিজের ইচ্ছায় ভবিষ্যতে কী বেছে নেবে, কিন্তু এই জানার কারণে মানুষের উপর কোনো জোর-জবরদস্তি তৈরি হয় না। আল্লামা ইবনে আশুর লিখেছেন যে মানুষ কাজ করার আগেও আল্লাহ তা জানেন, আবার সম্পাদনকালেও তা পরিবেষ্টন করে রাখেন। কিন্তু এই জানার অর্থ এই নয় যে আল্লাহ মানুষকে কোনো কাজ করতে বাধ্য করছেন। তিনি আরও বলেন, “এই আয়াতের মাধ্যমে পরিষ্কার হয় যে আদেশ-নিষেধ দেওয়ার একটি মূল প্রজ্ঞা হলো মানুষের আচরণের ওপর আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞানের প্রকাশ ঘটানো এবং মানুষের সামনে সত্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।” (ইবনে আশুর, আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ২৬/১২৩)। আল্লাহর জ্ঞান হলো আলোর মতো, যা ঘটনাকে উন্মোচিত করে, কিন্তু তা মানুষকে জোর করে কোনো কাজ করায় না।

ভাগ্যের অজুহাতে কাজ ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা রাসুল (সা.)-এর সময়েই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “সবকিছু যদি লেখা হয়েই থাকে, তবে আমরা কি কাজ ছেড়ে দিয়ে ভাগ্যের ওপর ভরসা করে বসে থাকব না?” মহানবী (সা.) উত্তর দিয়েছিলেন, “না, বরং কাজ করে যাও; কারণ যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সেই পথ সহজ করে দেওয়া হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৪৭) ইমাম রাজি এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, রাসুল (সা.) একদিকে আল্লাহর সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, অন্যদিকে মানুষকে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। এখানে ‘সহজ করে দেওয়া’ মানে জোর করা নয়; বরং মানুষ যে ভালো বা মন্দ পথ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করে, আল্লাহ তার জন্য সেই পথকেই সহজ করে দেন। (ফখরুদ্দিন আল-রাজি, মাফাতিহুল গাইব, ৩১/১৮৫) ইমাম ইবনে বাত্তাল বলেছেন, এই হাদিস মূলত তাদের ভুল প্রমাণ করে যারা মনে করে মানুষ নিজের ইচ্ছাহীন পুতুলমাত্র। কারণ পথ সুগম করে দেওয়া আর বাধ্য করা এক জিনিস নয়। মানুষ নিজের পছন্দ ও স্বাধীন ইচ্ছায় কাজ করে বলেই সে সওয়াব বা শাস্তির যোগ্য হয়। (আলি ইবনে খালাফ ইবনে বাত্তাল, শারহু সহিহিল বুখারি, ১০/৩০৩)

পরিশেষে বলা যায়, তকদির মানুষের হাত-পা বাঁধার ধারণা নয়। ভাগ্যে বিশ্বাস মানুষকে সফল হলে অহংকারী হতে দেয় না, আবার ব্যর্থ হলে হতাশায় ভেঙে পড়তেও দেয় না। মানুষ জানে, চেষ্টা করা তার নিজের নৈতিক দায়িত্ব, আর তার পরিণাম আল্লাহর প্রজ্ঞার উপর নির্ভরশীল।