স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের নোবেল ইনস্টিটিউট ফর ফিজিকসের পুরনো ভবনে প্রায় ৬৭ বছর আগে সুইডিশ বিজ্ঞানীদের একটি ছোট দল দাবি করেছিল যে তারা পর্যায় সারণির ১০২তম মৌলটি আবিষ্কার করেছে। আলফ্রেড নোবেল ও প্রতিষ্ঠানটির সম্মানে মৌলটির নামকরণ করা হয় নোবেলিয়াম। তবে এই দাবি নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক বিতর্ক, যা শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের দাবি প্রত্যাহারের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।
সুইডিশ দলটি নিজেদের হাতে তৈরি সস্তা যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য ল্যাব থেকে ধার করা টার্গেট ও রশ্মি ব্যবহার করে গবেষণা চালায়। তাদের প্রধান কৌশল ছিল ফিউশন পদ্ধতি, যেখানে হালকা নিউক্লিয়াসকে প্রচণ্ড গতিতে ভারী টার্গেটের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। তবে এই পদ্ধতিতে সাফল্যের সম্ভাবনা ছিল খুব কম, কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যৌগিক নিউক্লিয়াস তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে যায়।
১৯৫৪ সালে তারা প্রথমবার শততম মৌল ফার্মিয়াম আবিষ্কারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে তারা ১০২তম মৌলের জন্য ইংল্যান্ডের অ্যাটমিক এনার্জি রিসার্চ এস্টাবলিশমেন্ট ও মার্কিন আর্গন ল্যাবরেটরির সঙ্গে যৌথ গবেষণা শুরু করে। আর্গন ল্যাব থেকে আনা কুরিয়াম-২৪৪ আইসোটোপ ইংল্যান্ডে অ্যালুমিনিয়াম পাতের সঙ্গে সংযুক্ত করে স্টকহোমে পাঠানো হয়। সেখানে সুইডিশ সাইক্লোট্রনে কার্বন-১৩ আইসোটোপের রশ্মি দিয়ে টার্গেটগুলিতে আঘাত করা হয়।
১৯৫৭ সালে ছয়টি টার্গেটে প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে পরীক্ষা চালানোর পর সুইডিশ দল তিনটি টার্গেটে আলফা ক্ষয় প্রক্রিয়া শনাক্ত করে। তারা ৮.৫±০.১ মেগা ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তির আলফা বিকিরণ মাপে এবং মনে করে যে এটি প্রায় দশ মিনিট অর্ধায়ুর নোবেলিয়াম-২৫১ বা নোবেলিয়াম-২৫২ আইসোটোপের সাক্ষ্য। তবে পরবর্তী রাসায়নিক পরীক্ষায় কোনো মৌল পাওয়া যায়নি। তাদের ঘরে তৈরি ১৬ চ্যানেলের এনালাইজার ও সস্তা ডিটেক্টর যথেষ্ট সংবেদনশীল ছিল না বলে তারা জানতেন।
মার্কিন বিজ্ঞানী গ্লেন সিবর্গ ও আলবার্ট ঘিয়োরসো এই ফলাফল শুনে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তারা নিজেরা পরীক্ষা পুনরাবৃত্তি করে দেখেন যে সুইডিশদের দাবি অসম্পূর্ণ ও ভুল। মজা করে তারা মৌলটির নাম দেন ‘নো-বিলিভিয়াম’। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয় যে নোবেলিয়ামের হালকা আইসোটোপের অর্ধায়ু তিন মিনিটের বেশি হতে পারে না, অথচ সুইডিশরা দশ মিনিটের কথা বলেছিল। তাদের শনাক্ত করা মৌলটি আসলে প্রায় আট মিনিট অর্ধায়ুর থোরিয়াম-২২৫ আইসোটোপ বলে নিশ্চিত করা হয়, যা ওই ধরনের বিক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের চাপে সুইডিশ দল প্রাথমিকভাবে তাদের দাবিতে অটল থাকলেও, বছর দুয়েক পরে আনুষ্ঠানিকভাবে আবিষ্কারের দাবি প্রত্যাহার করে নেয়। এই ঘটনা পর্যায় সারণির প্রান্তসীমা বিস্তৃত করার অপেক্ষাকে আরও দীর্ঘ করে। নোবেল ইনস্টিটিউটের সেই ঐতিহাসিক অভিযান এখন অনেকের স্মৃতি থেকে মুছে গেলেও, কিছু গবেষক এখনও মনে করেন যে সুইডিশরা সত্যিই মৌলটি তৈরি করতে পেরেছিল কিন্তু তা গ্রহণ করা হয়নি। তখন পর্যন্ত বার্কলির রেডিয়েশন ল্যাবরেটরি ট্রান্সইউরেনিয়াম মৌল আবিষ্কারে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছিল, যা ভাঙতে রুশ বিজ্ঞানীদের আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হয়।




