গ্রাফিক ডিজাইনারদের সৃজনশীল সত্তাকে ক্লায়েন্টের বাঁধাধরা প্রয়োজনের বাইরে তুলে ধরার লক্ষ্যে শুরু হয়েছে এক ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী। ‘বিয়ন্ড দ্য ব্রিফ’ বা ‘নির্দেশনার বাইরে’ শিরোনামের এই আয়োজনটি পরিচালনা ও কিউরেট করেছেন শিল্পী মাহবুবুর রহমান। বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শনালয়ে এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত ১৮ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছেন দশজন শিল্পী—মাহবুবুর রহমান, ইমরান হোসেন পিপলু, মনির মৃত্তিকা, আলী সাগর, শেখর শাশ্বত, পীযূষ তালুকদার পিন্টু, সনৎ কুমার বিশ্বাস, মিতা মেহেদী, মেহেদী হাসান ও শিমুল দত্ত। সবাই গ্রাফিক ডিজাইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং পেশাগতভাবে এই ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত।

কিউরেটর নিজেও একজন অংশগ্রহণকারী শিল্পী। তাঁর কিউরেটিং নোটে বলা হয়েছে, শিল্পের ইতিহাসে আধুনিকতাবাদ, কিউবিজম ও দাদা আন্দোলন গ্রাফিক ডিজাইনের বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে আমেরিকার প্রপাগান্ডা পোস্টার এর উদাহরণ। শিল্পবিপ্লবের সময় রুশ গঠনবাদ (কনস্ট্রাক্টিভিজম) আন্দোলনের প্রভাবে আকার ও গঠনশৈলীর শক্তি স্পষ্ট হয়। জুরিখের পোস্টার ও সাইনবোর্ডে সেই ধারা এখনও দেখা যায়। ২০২৫ সালে জুরিখ সফরে দাদা আন্দোলনের সূতিকাগার ‘ক্যাবারে ভলতেয়ার’ ও ‘কুনস্তহাউস জুরিখ’-এর সংগ্রহ, বিশেষ করে পোস্টার দেখে তারা অনুপ্রাণিত হন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই মাহবুব ও তাঁর সহকর্মীরা দেশে এমন আয়োজনের পরিকল্পনা করেন।

প্রদর্শনী শুরু হয়েছে একটি সুপ্রশস্ত কাচের দরজার ডান পাশে কিউরেটিং নোট দিয়ে। এর পরের দেওয়ালে তরুণ শিল্পী শেখর সাখাওয়াতের তিনটি কাজ—‘আ ট্রিবিউট টু দ্য আলটিমেট’, ‘গ্রাটিচুড’ ও ‘পারসেপশন অব দ্য আলটিমেট’। চুল দিয়ে সূচিকর্ম ও সাদা সূচিনকশা করা পটের ওপর সাদা রঙের লেখাগুলো ঐতিহ্যের পরিশীলিত সৌন্দর্য ও আধুনিকতার স্বাধীনতার মধ্যে দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলে।

কিউরেটর মাহবুবুর রহমানের ‘নেট ওয়েট: দ্য স্ট্যান্ডারাইজড সেলফ’ শিরোনামের কাজটিতে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বাক্সে সাজানো রয়েছে নাক, কান, চোখ, আঙুলের মতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রতিরূপ। করপোরেট বাণিজ্যের বিশ্বে অর্থপ্রবাহের আধিক্যে মানুষ ও তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এখন পণ্যে পরিণত হয়েছে—এমন বার্তা দিচ্ছে এই শিল্পকর্ম।

সনদ বিশ্বাসের ‘অসম্পূর্ণ কিংবদন্তি’ একটি অ্যানিমেটেড ভিডিও আর্ট। গ্যালারির ভেতরের অন্ধকার ঘরে প্রজেকশনে দেখা যায় শ্মশানে ধ্যানরত তান্ত্রিক গুরু, তারপর এক মাংসভুক সুপারম্যান ও তৃণভোজী ডাইনোসরের সংঘর্ষ, শেষে তাদের মিলনে সৃষ্টি হয় ডাইনোম্যান। ব্যঙ্গের মাধ্যমে এটি সীমানা রক্ষার তাগিদ দেয়, যা দর্শকদের জন্য শিক্ষণীয়।

ইমরান হোসেন পিপলুর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, গ্রাফিক ডিজাইনারদের সৃজনশীল কাজ প্রায়ই ক্লায়েন্টের পছন্দের কারণে বাতিল হয়, যা তাদের সৃজনসত্তাকে আঘাত করে। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে তারা সেই প্রত্যাখ্যানকে কেন্দ্র করে শিল্পীর নিজস্ব চিন্তা ও দর্শকের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া তৈরি করতে চেয়েছেন। পিপলু প্রধানত কাগজের ভাস্কর্য করেন। তাঁর ‘মার্জিনস অব এরর’ শিরোনামের তিনটি কাজে বড় অক্ষরে লেখা সংলাপ: ‘ফুড ফর দ্য হাংরি’, ‘(সেফ নয়) সেভ দ্য চিলড্রেন’, এবং ‘স্মলেস্ট স্টেজ ইউএস ইজ ইউএন আইডেনটিফাইড’। অক্ষর সাজিয়ে বিশ্ব সংস্থার অকার্যকারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।

মিতা মেহেদী ঢাকা মহানগরের তিনটি এলাকার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে তিনটি চিত্রপট তৈরি করেছেন। ‘ভূতের গলি’ চিত্রপটে কালো রঙের মধ্যে গলির অবয়ব, ছাই রঙ ও অনুজ্জ্বল বস্ত্রখণ্ড, ইলেকট্রিক খাম্বা ও মাকড়সার জাল দিয়ে গলিটিকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘কলাবাগান’ চিত্রপটে কলাগাছ, লাল সূর্য ও রিকশা দেখা যায়। ‘কাঁটাবন’ চিত্রপট কণ্টকে ভরা নকশায় তৈরি।

মেহেদী হাসানের কাজের শিরোনাম ‘উই আর নাইনটি এইট পারসেন্ট হিউম্যান’। প্লাস্টিক কাগজের বোর্ডে মানব অবয়বসদৃশ ছয়টি দেহকাঠামোর ভেতরে ইলাস্ট্রেশনের মতো রেখাঙ্কন, নারী অবয়বের ফ্রকে বৃত্তাকার নকশায় স্লোগান স্থান পেয়েছে।

আলী সাগর শহরের বিলবোর্ডের আদলে একটি কাজ তৈরি করেছেন। তাতে বড় অক্ষরে লেখা ‘ফিল মোর’, নিচে হার্ট ও বৃত্তাকারে ‘মেড বাই দ্য ইউনিভার্স’ এবং আরও লেখা—‘আমাদের অসম্পন্ন সৃজন দিয়ে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চেষ্টা করেছি, কারণ শেষ পর্যন্ত অনুভূতিই সবকিছু’।

মনির মৃত্তিকা সবুজ, হলুদ ও নীল প্লাস্টিকের পাটি বিছিয়ে নদীসহ একটি জমিন তৈরি করে তার ওপর ‘উন্নয়ন’ লেখা ছোট ইট সাজিয়ে স্থাপনার সমাবেশ ফুটিয়ে তুলেছেন। দর্শক চাইলে সেই ইট দিয়ে নিজের পছন্দের কিছু তৈরি করতে পারেন। সবুজের শরীরে কংক্রিটের হানা নিয়ে শিল্পী বলতে চেয়েছেন—ফসলি জমিতে উন্নয়নের ইট স্থাপনা প্রকৃতিকে সংকুচিত করছে।

শিমুল দত্তের ‘ইন আ পারফেক্ট ইলিউশন’ কাজটিতে সাদা দেওয়ালে ঝোলানো ক্যাপসুল, ডিম, চাল ও সম্পদের বস্তায় নানা লেখা। ক্যাপসুলের গায়ে লেখা ‘তোমার স্বাস্থ্য আমার অধীনে’, ডিমে ‘মেয়াদকাল অসীম’—করপোরেট বাণিজ্যের পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন তিনি।

পীযূষ তালুকদার পিন্টু গড়েছেন ‘গুজবের কান’। বড় আকৃতির একটি কান, যার ফুটো দিয়ে ঝুলছে নানা রঙের সুতো। দুই পাশে লেখা—‘এই নিয়েছে ঐ চিল, যা কান নিয়েছে গুজবে’। গুজব ছড়ানোর সহজতা ও আত্মঘাতী প্রকৃতির প্রতি ইঙ্গিত।

দক্ষিণের কাচের দেওয়ালে দশ শিল্পী যৌথভাবে কাগজ ও প্লাস্টিক কেটে নানা মজার ইমেজ তৈরি করেছেন, যা দর্শকদের জন্য আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করছে। আশার কথা, নতুন প্রজন্ম মন দিয়ে কাজগুলো দেখছে ও ছবি তুলছে। প্রদর্শনী শেষ হবে আগামী ৮ আগস্ট। রোববার ছাড়া প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকবে।