এক সময় ফেলে দেওয়া কাঁঠালের বীজ থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তৈরির এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশের গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। তাঁদের উদ্ভাবিত 'মিনারেল কনসেন্ট্রেট' বা ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তৈরির এই পদ্ধতি ইতিমধ্যেই সরকারের পেটেন্ট (বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ) অর্জন করেছে।
গবেষক দলটির নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়টির খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এমদাদুল হক এবং তার সঙ্গে ছিলেন স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী আকরাম হোসেন। দীর্ঘ তিন বছর গবেষণার পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে তারা এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে গত বুধবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই সফলতার কথা প্রকাশ করে।
গবেষণার অর্থায়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের 'গ্র্যান্টস ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন' প্রকল্প। পরবর্তীতে উদ্ভাবনের স্বীকৃতিরূপে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর এর পেটেন্ট প্রদান করে। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরুর পর এটিই তাদের প্রথম পেটেন্টপ্রাপ্ত প্রযুক্তি, যা প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উপাচার্য অধ্যাপক জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান এই উদ্ভাবনকে দেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে অভিহিত করে বলেন, "গবেষকেরা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে কৃষিজ বর্জ্যও গবেষণার মাধ্যমে মূল্যবান পুষ্টিসমৃদ্ধ সম্পদে রূপান্তরিত করা সম্ভব।"
অধ্যাপক এমদাদুল হক জানান, বাংলাদেশ বৈশ্বিকভাবে অন্যতম প্রধান কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্বেও বিপুল পরিমাণ বীজ, খোসা ও অন্যান্য অবশেষ বর্জ্য হিসেবে নষ্ট হয়। অথচ শুকনা কাঁঠালের বীজে প্রায় ২ শতাংশ খনিজ উপাদান থাকে, যা নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘনীভূত করে ৩৩ শতাংশেরও বেশি মিনারেল কনসেন্ট্রেট তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ, খনিজের ঘনত্ব প্রায় ১৬ থেকে ১৭ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
এই বিশেষ উপাদানটি অত্যন্ত সহজেই বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা যাবে। যেমন রুটি তৈরির সময় আটা বা ময়দার সঙ্গে, কিংবা বিস্কুট ও কেকের মতো নানা খাদ্যপণ্যে এটি সংযোজন করা সম্ভব। এতে খাবারের পুষ্টিমান বাড়লেও স্বাদ ও ব্যবহারিক গুণাগুণে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না।
উদ্ভাবকদের মতে, শুধু গাজীপুর এলাকায় প্রতি বছরই প্রায় ৬ হাজার টন কাঁঠালের বীজ নষ্ট হয়। এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে যেমন নতুন পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য উন্নয়ন হবে, তেমনি কাঁঠালভিত্তিক একটি শিল্পও গড়ে উঠতে পারে। এর ফলে অবহেলিত এই বীজ উচ্চমূল্য সংযোজিত খাদ্য উপাদানে রূপ নেবে, কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষিজ সম্পদের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, এটি তাদের উদ্ভাবিত ২১তম প্রযুক্তি। তবে প্রতিষ্ঠানটির নাম 'গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়' হিসেবে চালু হওয়ার পর থেকে এটি প্রথম পেটেন্টপ্রাপ্ত উদ্ভাবন, যা প্রযুক্তির গবেষণা ও বাণিজ্যিকীকরণের পথে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।




