যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার হায়াতপুর ও মোবারকপুরসহ কয়েকটি গ্রামের কৃষকরা এখন মালচিং পদ্ধতিতে বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছেন। এর মাধ্যমে অল্প খরচে অধিক উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে, যে কারণে স্থানীয় অনেক কৃষক এখন এই আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি গ্রহণ করছেন। হায়াতপুর গ্রামের কৃষক মুকুল হোসেন ৪৫ শতক জমিতে করলার আবাদ করেছিলেন। তিনি জানান, বিক্রি শেষে ইতিমধ্যেই তাঁর খরচ বাদ দিয়ে ৮০ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। গোটা মৌসুমের ব্যবসার হিসাব করলে তাঁর প্রত্যাশা, লাভের পরিমাণ লাক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিয়ে রাজগঞ্জের হায়াতপুর ও মোবারকপুরের মাঠ এখন শ্রাবণেও সবজিতে পরিপূর্ণ দেখা যাচ্ছে। আগে এই সময় অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলে সবজির গোড়া পচে গাছ মারা যেত এবং ফসলের মাঠ প্রায় খালি থাকত। কিন্তু মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহার করায় সেই সমস্যা দূর হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান টুকু জানান, ছয় বছর আগে তিনিই প্রথম এই অঞ্চলের মাঠে মালচিং পদ্ধতিতে সবজির আবাদ শুরু করেন। বর্তমান মৌসুমে তিনি চার বিঘা জমির মধ্যে আড়াই বিঘায় এই প্রযুক্তিতে খিরাই ও বেগুন চাষ করেছেন। শুরুতে এলাকার লোকজন এটিকে ঝামেলা বলে এড়িয়ে গেলেও তার সফলতার দেখে এখন প্রায় সব কৃষকই পদ্ধতিটি ব্যবহার করছেন বলে মন্তব্য করেন।

মালচিং পদ্ধতিটির মূল প্রক্রিয়া হলো, জমির মাটি ভালোভাবে তৈরি করার পর বিশেষ পলিথিন শিট দিয়ে বেড ঢেকে ফেলা হয়। তারপর নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পলিথিনে ছিদ্রের মাধ্যমে সবজির চারা রোপণ করা হয়। এর ফলে জমির আর্দ্রতা অনেকদিন পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে, আগাছা জন্মাতে পারে না, এবং অতিরিক্ত পানি বেডের দুপাশ দিয়েক বের হয়ে যায়। উপরন্তু, পলিথিনের প্রতিফলিত আলো গাছের পাতার নিচে লুকিয়ে থাকা ক্ষতিকারক পোকামাকড় ও তাদের ডিম ধ্বংস করতে কার্যকর, যার ফলে কীটনাশকের প্রয়োজনীয়তা কমে আসে। এই সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলক অল্প খরচে নিরাপদ ও সতেজ সবজির ফলন অনেক বেশি পাওয়া যায়।

কৃষক মুকুল হোসেন জানান, প্রচলিত চাষে শ্রাবণের পানি জমে গাছের গোড়া পচার পাশাপাশি আগাছা দমন ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে বাড়তি শ্রমিক ও ওষুধের প্রয়োজন হয়। কিন্তু মালচিং পদ্ধতি গ্রহণের ফলে সেই সব বাড়তি খরচ বেঁচে যায় এবং ফলন বৃদ্ধি পায়। একই ধরনের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন অন্যান্য চাষীরাও। এর পেছনে রয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নবলোক পরিষদের উদ্যোগ। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) আর্থিক সহায়তায় সংস্থাটি মনিরামপুর উপজেলার ১০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি প্রত্যেককে ১৫ হাজার টাকা মূল্যের মালচিং উপকরণ সরবরাহ করেছে। সংস্থাটির কৃষি কর্মকর্তা প্রিন্স হালদার জানান, উত্তম কৃষি চর্চার অধীনে প্রথম দফায় এই ১০ জন কৃষক সফলতার সাথে কাজ করছে। ভবিষ্যতে আরও ৫০ জন কৃষককে এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মনিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার প্রথম আলোকে বলেছেন, মালচিং পদ্ধতি অবলম্বন করলে সবজি চাষে ২০ শতাংশ শ্রমিক এবং ৩০ শতাংশ রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমে যায়। পাশাপাশি, আবহাওয়ার তারতম্যের উপর ভিত্তি করে উৎপাদন ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোর জন্যই কৃষি বিভাগ কৃষকদের এই পদ্ধতি বাস্তবায়নে নিরন্তর উৎসাহিত করছে।