প্রায় আড়াইশ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ভিত্তি স্থাপন করেছিল জনগণের ওপর আস্থা রেখে। সেই বাজি এখন আবারও পরীক্ষিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ফরচুন সাময়িকীর এক লেখক। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার একাধিক উদাহরণ উঠে এসেছে। বিশ্বখ্যাত ডিজাইন প্রতিষ্ঠান অ্যারাপের এক অর্থ কর্মকর্তা একটি ভুয়া ভিডিও কলে ২ কোটি ৫৬ লাখ ডলার স্থানান্তর করেন, যেখানে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কৃত্রিম সংস্করণ তার সাথে কথা বলে। মুখাবয়ব ও কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ বাস্তব মনে হলেও নির্দেশনাগুলো ছিল পুরোপুরি মিথ্যা। এ ধরণের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। অন্যদিকে, স্টারবাকস তাদের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত মজুত ব্যবস্থাপনা সিস্টেম মাত্র নয় মাস ব্যবহারের পর বাতিল করতে বাধ্য হয়, কেননা বারিস্তারা জানান, এটি পণ্যের হিসাবে ভুল করছিল ও কাজের গতি শ্লথ করে দিচ্ছিল। একইসাথে, ডেলয়েটের অস্ট্রেলিয়ান সদস্য প্রতিষ্ঠান সরকারি বরাবর একটি ২ লক্ষ ৯০ হাজার ডলারের এআই-সহায়তায় তৈরি প্রতিবেদনের জন্য আংশিক অর্থ ফেরত দিতে রাজি হয়, যাতে কাল্পনিক একাডেমিক সূত্র ও বানোয়াট আদালতের উদ্ধৃতি ব্যবহৃত হয়েছিল। প্রযুক্তি ও শিল্প ভিন্ন হলেও ব্যর্থতার ধরন একই: মানুষ ফলাফল, ব্যক্তিপরিচয় কিংবা পুরো ব্যবস্থাকেই বিশ্বাস করতে পারেনি।

বস্তুত, বিশ্বাস এখন অর্থনৈতিক অবকাঠামোর রূপ নিচ্ছে। যে সব প্রতিষ্ঠান এটি তৈরি করতে পারবে না, তারা ধীর গতির হবে, ব্যয় বাড়বে এবং বাজা হারাবে। যেখানে বিশ্বাস সুদৃঢ়, সেখানে পুঁজি প্রবাহিত হয়, অংশীদারিত্ব গড়ে ওঠে এবং কোম্পানি বড় হয়। এটি অন্ধবিশ্বাস নয়, বরং অর্জিত দৃঢ়তা যে তথ্য সঠিক, ব্যক্তিপরিচয় অকৃত্রিম, ব্যবস্থা সুরক্ষিত, চুক্তি সম্মানিত হবে এবং কোনোকিছু ভুল হলে জবাবদিহি করার কেউ থাকবে। ব্যবসায়িক ভাষায়, বিশ্বাস সংঘর্ষ কমায়। কৌশলগত দৃষ্টিতে, এটি গতি সৃষ্টি করে।

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকীতে স্মরণ করার বিষয় হলো, বিশ্বাস প্রতিষ্ঠাকালের কোনো আনুষঙ্গিক বিষয় ছিল না, এটাই ছিল মুখ্য বাজি। 'স্বাধীনতা ও উদ্যোগ' সিরিজের প্রবন্ধে লেখক উল্লেখ করেছেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ভিত্তি বাজি, যা মানুষকে স্বাধীনভাবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা তৈরি করে এবং ব্যর্থ হতের স্বাধীনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সুবিধা। ইতিহাসের অধিকাংশ সময়েই শৃঙ্খলা ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হতো, কারণ শাসকরা সাধারণ মানুষকে ক্ষমতা দিতে বিশ্বাস করত না। স্বাধীনতার ঘোষণা যুক্তিকে উল্টে দেয়। ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরকারীরা তাদের জীবন, ভাগ্য ও পবিত্র সম্মান উৎসর্গ করেছিলেন একজন রাজাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্যে নয়, বরং সেইসব নাগরিকদের বিশ্বাস করতে যাদের সঙ্গে তাদের কোনোদিন দেখা হবে না এবং সেই সব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর যাদের তারা কখনো দেখতে পাবেন না। এই বিশ্বাস অর্থনৈতিক সুবিধায় পরিণত হয়: উদ্যোক্তারা রাজকীয় অনুমতি ছাড়াই ব্যবসা শুরু করতে পারে, বিনিয়োগকারীরা ধারণায় পুঁজি লাগাতে পারেন কারণ সম্পত্তির অধিকার ও চুক্তির মূল্য রয়েছে, এবং প্রতিভা যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে আসতে পারে।

বর্তমানে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রিয়েল টাইমে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসের সামর্থ্য পরীক্ষা করছে। এআই বিজ্ঞান, উৎপাদন, ওষুধ, সরবরাহ ও উৎপাদনশীলতা ত্বরান্বিত করতে পারে। কিন্তু এটি একইসাথে বিশ্বাসযোগ্য মিথ্যাচার তৈরি করতে পারে, একজন নির্বাহীর কণ্ঠস্বর ক্লোন করতে পারে, অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং অবিশ্বাস্য গতিতে ত্রুটির স্বয়ংক্রিয়করণ করতে পারে। সমাধান এআই বন্ধ করা নয়, বরং এর মধ্যে বিশ্বাস নির্মাণ করা: নির্ভরযোগ্য উপাত্ত, উৎস-সন্ধানযোগ্যতা, শক্তিশালী পরিচয় নিয়ন্ত্রণ, স্বাধীন পরীক্ষা, মানবীয় জবাবদিহিতা, স্পষ্ট নিয়ম এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে অর্থপূর্ণ প্রতিকার। উদ্ভাবন বিশ্বাস ছাড়া পরীক্ষামূলক স্তরেই থমকে যায়। বিশ্বাসের সঙ্গে উদ্ভাবন অবকাঠামোয় পরিণত হয়। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এআই প্রতিযোগিতা শুধু মডেলের দৌড় নয়, এটি পুরো উদ্ভাবন বাস্তুতন্ত্রের প্রতিযোগিতা: প্রতিভা, গবেষণা, পুঁজি, সুরক্ষিত অবকাঠামো, স্থিতিস্থাপক সরবরাহ শৃঙ্খল, মিত্রদের গ্রহণযোগ্যতা ও বাণিজ্যিকভাবে উন্নত পণ্য। যে বাস্তুতন্ত্র সর্বোচ্চ আস্থা অর্জন করবে, সেটিই সর্বাধিক নির্মাতা, ক্রেতা, অংশীদার ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে।

লেখক তার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থেকে উল্লেখ করেছেন, এরিবাতে তারা সংগ্রহ কার্যকে কাগজ থেকে বৈশ্বিক ডিজিটাল নেটওয়ার্কে নিয়ে আসেন। ডকসাইনে হাতে লেখা স্বাক্ষরের জায়গায় ডিজিটাল চুক্তি চালু করেন। শুধু প্রযুক্তির জোরে এই রূপান্তর বিশাল আকারে সফল হতে পারত না, পণ্যের মাঝে পরিচয়, নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, বলবত্করণ ও জবাবদিহিতা তৈরি করে দিতে হয়েছিল। একই নীতি তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি হিসেবে বিশ্বব্যাপী ৫জি নেটওয়ার্ক সুরক্ষিত করতে গিয়ে দেখেছেন। মূল প্রশ্ন ছিল কে দ্রুততম বা সস্তায় নির্মাণ করতে পারে তা নয়, বরং বাণিজ্য, অর্থায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি, পরিবহন ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সংবেদনশীল তথ্য বহনের জন্য কাকে বিশ্বাস করা যায়। এটিই ছিল ক্লিন নেটওয়ার্কের ভিত্তি, যা বিশ্ব জিডিপির দুই-তৃতীয়াংশ এবং ২০০ টিরও বেশি টেলিকম কোম্পানির প্রতিনিধিত্বকারী ৬০ দেশে পরিণত হয়।

সিইও এবং পরিচালনা পর্ষদের জন্য, বিশ্বাসকে একটি ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা হিসেবে নিতে হবে, কোনো যোগাযোগ অভিযান হিসেবে নয়। প্রতিটি নেতৃত্বের দলকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হওয়া উচিত: আমরা কি নিশ্চিত করতে পারি কে নির্দেশনা দিচ্ছে? আমরা কি আমাদের তথ্য ও এআই আউটপুটের উৎস খুঁজে বের করতে পারি? আমরা কি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীলতা জানি? কোনো সিস্টেম ব্যর্থ হলে জবাবদিহিতা কি স্পষ্ট? উত্তর যদি 'না' হয়, তবে কোম্পানির কেবল সুনামের সমস্যা নেই, তার একটি পরিচালন ঝুঁকি বিদ্যমান।

যুক্তরাষ্ট্র অতীতেও বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ করেছে, সংগ্রাম ও অসম্পূর্ণতার মধ্য দিয়ে। মার্কিন ব্যবস্থার প্রতিভা কোনো ভাঙনহীন বিশ্বাস নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রতিযোগিতা, আইনের শাসন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও জনগণের স্বশাসনের মাধ্যমে তা পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা। প্রতিষ্ঠাতারা তাদের জীবনের সব কিছু বাজি রেখে যে দেশ তৈরি করেছিলেন তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি বিশ্বাস রেখে দিয়েছিলেন। সেই দায়িত্ব এখন আমাদের। যখন তথ্য যাচাইযোগ্য, পরিচয় সনাক্তযোগ্য, চুক্তি সম্মানিত, নেতারা আস্থা অর্জন করে, প্রতিষ্ঠানগুলো জনসেবায় নিয়োজিত এবং নাগরিকরা পরস্পরের ওপর বিশ্বাস রাখে, তখনই স্বাধীনতা টিকে থাকে। এআইয়ের যুগে, বিশ্বাস উদ্ভাবনের বিকল্প নয়, বরং এটি সেই শর্ত যা উদ্ভাবনকে বিস্তৃতি লাভ করতে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে বিশ্বাসের জায়গায় নিয়ন্ত্রণ দিয়ে নয়, বরং তা পুনরায় অর্জনের মাধ্যমে। আড়াইশ বছর আগে, আমেরিকা বিশ্বাসের ওপর সব কিছু বাজি ধরেছিল। সেই বাজিকে আবার সফল করতেই হবে। স্বাধীনতা তখনই কাজ করে যখন বিশ্বাস কাজ করে।