প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে রঙিন পালকের পাখি সবসময়ই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সম্প্রতি 'কনজারভেশন বায়োলজি' জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা এই ধারণাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পাখিদের উজ্জ্বল ও বর্ণিল পেখমই কিছু কিছু অঞ্চলে তাদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষক দলের সদস্য নাটালিয়া ওকাম্পো-পেনুয়েলা ও মন্টে নেট-ক্লেগ গত বছর ভিয়েতনামের জঙ্গলে এক বিশেষ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হন। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর তাঁরা দেখতে পান 'কলার্ড লাফিংথ্রাশ' নামের এক বিরল পাখি। কমলা, রুপালি ও কালো রঙের মিশেলে তৈরি এই পাখিটিকে অনেকেই 'হ্যালোইন পাখি' বা 'ভুতুড়ে পাখি' বলে থাকেন। মিষ্টি সুরে ডাকার ক্ষমতা এবং চোখজুড়ানো বর্ণের কারণেই খাঁচাবন্দী পোষা প্রাণী হিসেবে এর চাহিদা ব্যাপক। আইইউসিএন ইতোমধ্যেই এই পাখিটিকে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। পুরো বিশ্বে এদের বিচরণক্ষেত্র এখন মাত্র ২৩৯ বর্গমাইল এলাকায় সীমাবদ্ধ।
গবেষণায় প্যাসারিন জাতের পাখিদের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। কাক, চড়ুই, বাবুইসহ বিশ্বের অর্ধেকের বেশি পাখি এই দলের অন্তর্ভুক্ত। গাছের ডালে অনায়াসে বসে থাকার উপযোগী পায়ের গঠন থাকায় এরা যে কোনো পরিবেশের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিতে সক্ষম। গবেষকরা চারটি ভিন্ন কম্পিউটার মডেল তৈরি করে পাখিদের গায়ের রং, খাদ্যাভ্যাস, ডানার গঠন, শরীরের আকার, ভৌগোলিক অবস্থান এবং মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব বিশ্লেষণ করেন। চতুর্থ মডেলে পাখির ব্যবসার তথ্য যুক্ত করে দেখা হয় রঙিন পাখিদের কেনাবেচার হার কেমন।
সেসব মডেল থেকে চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। যেসব পাখির পালক যত বেশি উজ্জ্বল ও রঙিন, তাদের বিলুপ্তির ঝুঁকিও তত বেশি। তবে অঞ্চলভেদে এই ঝুঁকির কারণ ভিন্ন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খাঁচাবন্দি করে পোষা প্রাণী হিসেবে বিক্রির জন্যই মূলত রঙিন পাখিরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছে। অন্যদিকে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনই এদের অস্তিত্বের ওপর বড় আঘাত হানছে।
গবেষকরা আরও একটি রহস্যজনক বিষয় লক্ষ করেছেন। যে রঙিন পাখিগুলো কখনো পোষা প্রাণীর বাজারে বিক্রি হয় না, তারাও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ধাঁধার উত্তর এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। গবেষকদের ধারণা, অতিরিক্ত রঙ শিকারিদের নজরে পড়ার কারণ হতে পারে, অথবা তীব্র তাপমাত্রায় রঙিন পাখিদের শরীর ঠান্ডা রাখতে বেশি বেগ পেতে হয়। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে আরও গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
তবে গবেষণায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—শুধু পোষা প্রাণী হিসেবে কেনাবেচাই রঙিন পাখিদের বিলুপ্তির একমাত্র কারণ নয়। বনাঞ্চল ধ্বংস, অবাধ শিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক কারণগুলোর সম্মিলিত প্রভাবই পাখিদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলছে। গবেষক দলটি আশা করছে, এই গবেষণা ভবিষ্যতে পাখি সংরক্ষণের কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিগুলোকে রক্ষা করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সহায়তা করবে।




