আজ ১২ আগস্ট, বুধবার। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জন্য আজকের আকাশে সূর্যের পূর্ণগ্রাস দৃশ্য অদৃশ্য থাকবে; তবে একই সঙ্গে আজ ও আগামীকাল রাতে চোখে পড়বে বছরের অন্যতম আকর্ষণীয় মহাজাগতিক দৃশ্য—পারসিয়েড উল্কাবৃষ্টি। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার লাখো মানুষের কাছে আজ একটি বিশেষ দিন, কারণ তারা পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করতে পারবেন।

গ্রিনল্যান্ড থেকে উত্তর-পূর্ব স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সরু এলাকায় চাঁদ সূর্যকে সম্পূর্ণরূপে ঢেকে ফেলবে। সেখানে চাঁদের প্রায় ২৯০ কিলোমিটার প্রশস্ত কালো ছায়া পড়বে। পূর্ব গ্রিনল্যান্ড, পশ্চিম আইসল্যান্ড কিংবা উত্তর-পূর্ব স্পেনের মতো স্থানে অবস্থানকারীরা টানা ২ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের জন্য সূর্যকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য দেখবেন। তখন দিনের বেলাতেই চারপাশে অন্ধকার নেমে আসবে। ইউরোপের বেশির ভাগ অঞ্চলে সূর্যের অর্ধেকেরও বেশি অংশ ঢাকা পড়বে, আর উত্তর আমেরিকার কিছু এলাকায় ঢাকা পড়বে সামান্য অংশ। কিন্তু চাঁদের মূল ছায়াপথ এই অঞ্চলকে এড়িয়ে যাবে, ফলে বাংলাদেশ থেকে এ বছরের এই সূর্যগ্রহণ দেখা সম্ভব হবে না।

যদিও গ্রহণ এখান থেকে দেখা যাবে না, তবু উত্তর গোলার্ধে আজ ও কাল রাতে দেখা মিলবে বার্ষিক পারসিয়েড উল্কাবৃষ্টি। প্রতিবছর জুলাই থেকে আগস্ট মাসে এই ঘটনা ঘটে। উত্তর গোলার্ধে এই সময়ে আবহাওয়া বেশ উষ্ণ থাকে, ফলে রাতের আকাশে দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণের দারুণ সুযোগ তৈরি হয়। এ বছর সর্বোচ্চ দৃশ্য মিলবে ১২ আগস্ট রাত থেকে ১৩ আগস্ট ভোরের আলো ফোটার আগে পর্যন্ত। শহরের কৃত্রিম আলো থেকে দূরে কোনো অন্ধকার স্থানে গেলে আকাশে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০টি পর্যন্ত উল্কা ছুটে যেতে দেখা যেতে পারে।

এ বছরের পারসিয়েড উল্কাবৃষ্টির দৃশ্যটি বিগত বহু বছরের মধ্যে অন্যতম সেরা হতে চলেছে। কারণ, ঠিক একই সময়ে রয়েছে অমাবস্যা। ১২ আগস্ট চাঁদ থাকবে পৃথিবী ও সূর্যের একেবারে মাঝখানে, তাই চাঁদের আলো আকাশে প্রায় থাকবে না। রাতের আকাশ সম্পূর্ণ অন্ধকার থাকার কারণে ছুটন্ত উল্কাগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে ফুটে উঠবে। প্রতিবছর আকাশে যেসব উল্কাপাতের দৃশ্য দেখা যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে মনোরম এই পারসিয়েড।

মহাকাশে অনেক ভাসমান ধূমকেতু ও গ্রহাণু রয়েছে। যখন এসব মহাকাশীয় বস্তুর ছোট ছোট টুকরো পৃথিবীর দিকে ছুটে এসে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন ঘর্ষণের ফলে জ্বলে ওঠে। এই জ্বলন্ত টুকরোগুলোকেই আমরা উল্কা বলে থাকি। আর যখন একসঙ্গে অনেকগুলো উল্কা আকাশে আলোকিত হয়ে ওঠে, তখন সেই দৃশ্যকে বলা হয় উল্কাবৃষ্টি। সাধারণত উল্কাবৃষ্টির নামকরণ করা হয় যে নক্ষত্রমণ্ডল থেকে উল্কাগুলো আসছে বলে মনে হয়, সেই নক্ষত্রমণ্ডলের নামে। পার্সিয়াস নক্ষত্রমণ্ডলের নাম অনুসারে এই উল্কাবৃষ্টির নামকরণ হয়েছে পারসিয়েড। যেহেতু পার্সিয়াস উত্তর দিকে অবস্থিত, তাই উত্তর-পূর্ব দিকের আকাশে উল্কাবৃষ্টি তুলনামূলক বেশি দেখা যাবে; অন্যান্য অংশেও কম-বেশি দৃশ্য মিলবে।

পারসিয়েড উল্কাগুলো মহাকাশে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৬৫ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার পর এর গতি কমে দাঁড়ায় সেকেন্ডে প্রায় ৫৯ কিলোমিটারে। এই তীব্র গতির কারণেই বায়ুমণ্ডলের বাতাসের সঙ্গে ঘর্ষণে আগুন জ্বলে ওঠে, এবং আমরা আকাশে উজ্জ্বল আলোর রেখা দেখতে পাই। উল্কাগুলোর আকার সাধারণত বালির কণার মতো খুব ছোট হওয়ায় পৃথিবীর মাটিতে পড়ার আগেই বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তবে কোনো উল্কার আকার যদি বেশি বড় হয়, তবে তা পুরোপুরি পুড়তে পারে না; সেগুলো উল্কাপিণ্ড হয়ে পৃথিবীর বুকে এসে পড়ে।

এই দৃশ্য দেখার জন্য কোনো টেলিস্কোপ বা বাইনোকুলারের প্রয়োজন নেই। খালি চোখেই উল্কাবৃষ্টি উপভোগ করা সম্ভব। তবে ধৈর্য রাখতে হবে, কারণ উল্কা কখনো একসঙ্গে দেখা যায় না; একটি দুটি করে দেখা যায়। সূত্র হিসেবে লাইভ সায়েন্স, স্পেস ডটকম ও নাসার তথ্য উল্লেখযোগ্য।