ইসলামের ইতিহাসে হোদাইবিয়ার সন্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা প্রথমে পরাজয় বলে মনে হলেও পরে বিজয়ে রূপ নেয়। নবী মুহাম্মদ (সা.) স্বপ্নে দেখেছিলেন তিনি সাহাবিদের নিয়ে নিরাপদে ওমরাহ করছেন। সেই স্বপ্নের ভিত্তিতে প্রায় ১৪০০ সাহাবি ইহরাম বেঁধে মক্কার পথে রওনা হন। কিন্তু পথে হোদাইবিয়া নামক স্থানে কোরাইশরা তাদের পথ আটকে দেয়। দীর্ঘ আলোচনার পর একটি চুক্তি হয়, যার শর্তগুলো অনেক সাহাবির কাছে অপমানজনক মনে হয়। চুক্তি অনুযায়ী সে বছর ওমরাহ না করেই ফিরে যেতে হবে, এবং পরের বছর মাত্র তিন দিনের জন্য মক্কায় প্রবেশের অনুমতি মিলবে।
সাহাবিদের মধ্যে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সবচেয়ে বেশি ব্যথিত হন। তিনি নবীজির কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি সত্যিই আল্লাহর নবী নন?’ নবীজি শান্তভাবে জবাব দেন যে তিনি আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর আদেশ অমান্য করবেন না। ওমরের প্রশ্নটি অবিশ্বাস থেকে নয়, বরং ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে এসেছিল। পরবর্তী জীবনে তিনি এই দিনের জন্য অনুতপ্ত হয়ে নফল ইবাদত করতেন।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর নবীজি সাহাবিদে কোরবানির পশু জবাই করে ইহরাম ভাঙতে নির্দেশ দেন, কিন্তু কেউ সাড়া দেননি। বারবার বলার পরও সাহাবিরা হতাশায় নড়তে পারেননি। তখন নবীজি তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামা (রা.)-এর পরামর্শে নিজেই পশু জবাই করেন এবং মাথা মুণ্ডন করেন। তা দেখে সাহাবিরা দ্রুত তাঁর অনুসরণ করেন। উম্মে সালামার এই বুদ্ধিমত্তা ও নবীজির নেতৃত্ব সংকট কাটিয়ে ওঠে।
মদিনায় ফেরার পথে সুরা ফাতহের প্রথম আয়াত নাজিল হয়, যেখানে আল্লাহ এ ঘটনাকে ‘স্পষ্ট বিজয়’ বলে ঘোষণা করেন। সাহাবিরা অবাক হন, কিন্তু নবীজি বলেন এটাই আসল বিজয়। সময়ই প্রমাণ করে যে এই সন্ধির ফলে আরবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মানুষ নির্বিঘ্নে ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়। ইমাম জুহরির মতে, হোদাইবিয়ার পরের দুই বছরে ইসলাম গ্রহণের সংখ্যা নবুয়তের প্রথম ১৯ বছরের মোট সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় যে আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের সীমিত বোধগম্যতার ঊর্ধ্বে। যা প্রথমে ক্ষতি মনে হয়, তা-ই পরে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসাই মুমিনের আসল পরীক্ষা। হোদাইবিয়ার সন্ধি শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং প্রতিটি মুমিনের জীবনের জন্য প্রাসঙ্গিক শিক্ষা।




