বর্তমান সময়ে করপোরেট জগতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অবিরাম পরিশ্রমের একটি নতুন প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যা ‘হ্যাসেল কালচার’ নামে পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করা, রাত জেগে প্রকল্প শেষ করা কিংবা ছুটির দিনেও ব্যস্ত থাকাকে এক ধরনের বীরত্ব ও আকর্ষণীয় জীবনধারা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির এই অন্ধ প্রতিযোগিতায় তরুণেরা প্রথমেই বিসর্জন দিচ্ছে তাদের রাতের ঘুম। রাত জেগে কাজ করাকে বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন মনে করা হচ্ছে, অথচ এটি তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির তৈরি এই দেহকেন্দ্রিক ও বস্তুগত সাফল্যের মোহের বিপরীতে ইসলামি জীবনদর্শন মানুষের শারীরিক সুস্থতা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং জীবনের ভারসাম্যের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
ইসলাম মানুষকে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। দিন ও রাতের প্রাকৃতিক চক্রের সঙ্গে মানবদেহের গভীর জৈবিক সম্পর্ক বিদ্যমান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাতকে বিশ্রামের জন্য নির্ধারিত করে দেওয়ার কথা একাধিকবার উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই তোমাদের জন্য রাতকে করেছেন আবরণস্বরূপ এবং ঘুমকে করেছেন আরামপ্রদ, আর দিনকে করেছেন পুনরুত্থানের জন্য।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৪৭) আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমি তোমাদের ঘুমকে করেছি ক্লান্তি দূরকারী এবং রাতকে করেছি আবরণস্বরূপ, আর দিনকে করেছি জীবিকা অন্বেষণের জন্য।’ (সুরা নাবা, আয়াত: ৯-১১) এই চিরন্তন নিয়মকে উপেক্ষা করে কেবল ক্যারিয়ার ও অতিরিক্ত অর্থের লোভে কেউ যদি রাতকে দিনে পরিণত করে, তবে সে নিজের শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে।
ইসলামে মানবদেহকে আল্লাহর পবিত্র আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়। নিজেকে সফল প্রমাণের জন্য শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া বা অত্যাচার করার কোনো অনুমতি নেই। নবীজির যুগে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) আধ্যাত্মিক উন্নতির আশায় সারারাত জেগে ইবাদত করতেন এবং প্রতিদিন রোজা রাখতেন। এই সংবাদ নবীজির কাছে পৌঁছালে তিনি তাঁকে ডেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেন এবং ঐতিহাসিক একটি উপদেশ দেন। সহিহ বুখারির হাদিসে (১৯৭৫) এসেছে, তিনি বলেন, ‘তুমি রোজা রাখো এবং রোজা ভঙ্গও করো, রাতে নামাজ আদায় করো এবং ঘুমাও। কেননা নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে, তোমার ওপর তোমার চোখের হক রয়েছে এবং তোমার ওপর তোমার স্ত্রীরও অধিকার রয়েছে।’ যদি অতিরিক্ত নফল ইবাদতের জন্যও রাত জেগে চোখ ও শরীরের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ হয়, তবে শুধু পার্থিব ক্যারিয়ারের গ্ল্যামার ও অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের জন্য ঘুমের অবহেলা করা কত বড় অন্যায়, তা এ হাদিস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়।
দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং তীব্র বিষাদ, দুশ্চিন্তা ও খিটখিটে মেজাজ তৈরি হয়। মানুষ যত বেশি নিজেকে যন্ত্রের মতো খাটাতে চায়, ততই তার মানবিক কোমলতা ও মানসিক শান্তি হারিয়ে ফেলে। ইসলাম জীবনের সর্বক্ষেত্রে ভারসাম্যের (আদল) শিক্ষা দেয়। নবীজি (সা.) নিজে এশার নামাজের পরপরই দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার নির্দেশ দিতেন এবং গভীর রাতে উঠে নামাজ আদায় করতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৮)। এই রুটিন শরীর ও মন সুস্থ রাখার জন্য সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর। বর্তমান তরুণেরা এশার পর তাদের উৎপাদনশীলতার মূল সময় শুরু করে, যা তাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেও দূরত্ব সৃষ্টি করছে।
রাত জেগে অতিরিক্ত কাজের পেছনে মূল কারণ ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও দ্রুত ধনী হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এই মানসিকতা মানুষকে অদৃশ্য দাসত্বে বন্দী করে ফেলে। ইসলাম বিশ্বাসীকে শিক্ষা দেয় যে পরিশ্রম মানুষের দায়িত্ব, কিন্তু রিজিক দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো জীব নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬) নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দিনের বেলা সর্বোচ্চ পরিশ্রম করে রাতে আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করে ঘুমিয়ে পড়া প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। অতিরিক্ত আয়ের লোভে নিজের স্বাস্থ্য ধ্বংস করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, কারণ অসুস্থ শরীরে সেই অর্থ ভোগ করারও সুযোগ থাকে না। তরুণদের বুঝতে হবে যে ঘুম অলসতা নয়, বরং স্রষ্টার এক অনন্য নেয়ামত এবং শরীরের ন্যায্য অধিকার।




