রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় দেবী চৌধুরানী বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটি এখন রাজেকা রহমানের জীবনের সবকিছু। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিনি ব্যস্ত থাকেন এখানকার বাসিন্দাদের নিয়ে। কেউ অসুস্থ হলে পাশে থাকেন, কারও মন খারাপ থাকলে গল্প শোনান, নিজের হাতে রান্না করে খাবারও পরিবেশন করেন। রাজেকার ভাষ্যমতে, তাঁর নিজের আত্মীয়-স্বজনরা তাকে পরিত্যাগ করলেও এই আশ্রিত ব্যক্তিরা তাকে কখনো ছেড়ে যাবে না। তাদের সঙ্গে তাঁর আধ্যাত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছে।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে নিজ বাড়িতেই এই পুনর্বাসন কেন্দ্রের সূচনা করেন রাজেকা। কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটি ছিল অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে তিনি নিজের গলার সোনার চেইন, কানের দুল ও হাতের চুড়ি বিক্রি করে প্রায় ৭০ হাজার টাকা জোগাড় করেন। সেই অর্থ দিয়ে ২০ শতক জমি ক্রয় করে কেন্দ্রের নামে লিখে দেন। এই পদক্ষেপের পর তাঁর স্বামী তালাক দেন, পরিবারের সদস্যরাও দূরে সরে যান। সমাজের নানা কটূক্তি তাকে সহ্য করতে হয়। কিন্তু রাজেকা দৃঢ়ভাবে জানান, সব হারিয়েও তিনি অসহায় মানুষদের ছাড়েননি। তাঁর মতে, সে সিদ্ধান্তই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।

রাজেকার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে মিঠাপুকুর উপজেলার সংগ্রামপুর গ্রামে। বাবা রফিকুল ইসলাম একটি স্থানীয় মক্তবে শিক্ষকতা করতেন, মাসিক আয় ছিল মাত্র দুই হাজার টাকা। অভাবের সংসারে অনেক দিন না খেয়ে স্কুলে যেতে হতো তাঁকে ও তাঁর ভাইবোনদের। অল্প বয়স থেকেই তিনি অন্যের কষ্ট দেখে স্থির থাকতে পারতেন না; নিজের খাবারও অন্যদের দান করে দিতেন। বড় ভাই সিরাজুল ইসলাম তাঁকে দেবী চৌধুরানীর গল্প বলতেন, যিনি ছিলেন ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ও মানবসেবায় নিবেদিত প্রাণ। সেই গল্পই রাজেকার মনে মানবসেবার বীজ বপন করে। ২০০১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পরও দারিদ্র্য সঙ্গী ছিল; দীর্ঘদিন উপবাসেও কাটাতে হয়েছে। ২০০৫ সালে তিনি চৌধুরানী বাজারে একটি বিউটি পারলার চালু করেন এবং একটি বিমা প্রতিষ্ঠানে কাজ নেন। ধীরে ধীরে টাকা জমিয়ে ২০০৮ সালে স্বামীকে ব্যবসার মূলধন দেন। ব্যবসায় সাফল্য এলে সংসারে সচ্ছলতা ফিরে আসে। তখনই তিনি নিজের পুরোনো স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন।

২০১৮ সালের ২৫ আগস্ট প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ‘অসহায়ের সহায় রাজেকা’ শিরোনামে তাঁর মানবসেবার গল্প প্রকাশিত হয়। এরপর দেশ-বিদেশ থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন অনেকে। কেউ নগদ অর্থ, কেউ টিন, কেউ ইট পাঠিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কেন্দ্রটি নিবন্ধন লাভ করে। বর্তমানে এখানে ২৩ জন বাসিন্দা রয়েছেন। গত ৯ বছরে মোট ২০১ জন ব্যক্তি এখান থেকে তাদের পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন এবং ১৯ জন এখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

সম্প্রতি কেন্দ্রটি পরিদর্শনে দেখা যায়, মানুষের সহায়তায় চার কক্ষবিশিষ্ট একটি নতুন পাকা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। রাজেকা প্রথম আলোর পাঠকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, কেন্দ্রটি পরিচালনায় প্রতিমাসে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয় এবং দেশবাসীর সহযোগিতায় তা মেটানো সম্ভব হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, একজন ব্যক্তি ১০ হাজার ইট দিয়েছেন, যা দিয়ে নতুন ভবনের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি অঙ্গীকার করেন, যত দিন বেঁচে থাকবেন ততদিন এই মানুষগুলোর সেবা করে যেতে চান।

রাজেকার ভাই সিরাজুল ইসলাম জানান, ছোটবেলা থেকেই রাজেকা মানুষের পাশে দাঁড়াত। তিনি ২০ শতক জমি পুনর্বাসন কেন্দ্রের নামে লিখে দেওয়ায় পরিবারের সদস্যরা প্রথমে তাকে অপদস্থ করে। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পেরেছেন, রাজেকাকে অপদস্থ করা ঠিক হয়নি। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, রাজেকা রহমান অসহায় মানুষের জন্য নিবেদিত। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকেও বিভিন্ন সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।