প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রসুন রাখেন অনেকেই। কেউ খালি পেটে কাঁচা কোয়া চিবিয়ে খান, কেউবা থেঁতো করে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে নেন। তবে স্বাস্থ্য উপকারিতার জন্য রসুনের একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌগ অ্যালিসিনের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে, যার উৎপাদন নির্ভর করে রসুন প্রস্তুতের পদ্ধতির ওপর। খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রসুনের কোষ কাটা, থেঁতো বা চিবানোর ফলে এর ভেতরের অ্যালিইন এবং অ্যালিইনেজ এনজাইম পরস্পরের সংস্পর্শে এসে অ্যালিসিন তৈরি করে। এই অ্যালিসিনের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তবে রসুনের সব উপকার শুধু এই একটি উপাদানের ওপর নির্ভর করে না—এতে আরও অনেক সালফার-যৌগ বিদ্যমান।

অ্যালিসিনের পরিমাণ বাড়াতে রসুন ভালোভাবে থেঁতো বা মিহি করে কুচি করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। পুরো কোয়া গিলে ফেলার চেয়ে বা মোটা করে কাটার চেয়ে থেঁতো বা ক্রাশ করলে রসুনের বেশি কোষ ভেঙে যায়, ফলে অ্যালিইন ও অ্যালিইনেজ এনজাইমের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সুযোগ বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, পুরো কোয়া রান্নার তুলনায় থেঁতো করা রসুনে জৈব সক্রিয় অর্গানোসালফার যৌগের পরিমাণ বেশি থাকে। থেঁতো বা কুচি করার পর রসুনটি ঘরের তাপমাত্রায় ৫ থেকে ১০ মিনিট রেখে দিলে অ্যালিসিন তৈরির প্রক্রিয়া ভালোভাবে সম্পন্ন হয়। এই সময়টুকু অপেক্ষা করাকে কঠোর 'ম্যাজিক টাইম' না ভেবে রান্নার আগে একটি ব্যবহারিক নিয়ম হিসেবে দেখা ভালো বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

যারা কাঁচা রসুন খেতে চান, তাদের জন্য থেঁতো করা তাজা রসুন কিছুক্ষণ রেখে মধু, লেবু, অলিভ অয়েল বা দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া উত্তম। সালাদ ড্রেসিং বা চাটনিতেও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে রান্না করলেই রসুনের সব গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়। তাপে অ্যালিইনেজের কার্যকারিতা কমে গেলেও রান্না করা রসুনে অন্যান্য উপকারী সালফার-যৌগ থাকে। তাই কাঁচা রসুনকে একমাত্র স্বাস্থ্যকর আর রান্না করা রসুনকে অকার্যকর ভাবার কোনো কারণ নেই। রান্নায় রসুন ব্যবহার করলে প্রথমে থেঁতো বা কুচি করে কয়েক মিনিট রেখে দিয়ে, খাবারের শেষের দিকে যোগ করা ভালো। দীর্ঘ সময় উচ্চ তাপে ভাজা বা সিদ্ধ করলে অ্যালিসিন তৈরির এনজাইম নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে।

অ্যালিসিন ছাড়াও রসুনে রয়েছে অ্যালিইন, অ্যাজোইন, ডাইঅ্যালাইল সালফাইড, এস-অ্যালাইল সিস্টেইনসহ বিভিন্ন সালফার-যৌগ। এছাড়া ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ ও সেলেনিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদানও পাওয়া যায়। বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল গবেষণা ও মেটা-বিশ্লেষণে রসুনের সঙ্গে রক্তচাপ, রক্তের লিপিড, রক্তে শর্করা, প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের কিছু সূচকের উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এই গবেষণাগুলোর ফল একেবারে অভিন্ন নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে নির্দিষ্ট ধরনের রসুনের নির্যাস বা সাপ্লিমেন্ট—সাধারণ খাবার হিসেবে খাওয়া তাজা রসুন নয়। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রসুনের নির্যাস কিছুটা কার্যকর বলে ২০২৫ সালের একটি হালনাগাদ মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তবে এটি উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের বিকল্প নয়। একইভাবে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রসুনের সম্ভাব্য ভূমিকা থাকলেও সব গবেষণায় একই ফল পাওয়া যায়নি এবং এটিকে ওষুধের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে রসুনের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিভাইরাল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেলেও মানুষের ক্ষেত্রে ঠান্ডা-সর্দি বা ফ্লু প্রতিরোধে এর কার্যকারিতার প্রমাণ এখনও সীমিত। কোক্রেনের পর্যালোচনাতেও সাধারণ সর্দি প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় রসুনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কিছু গবেষণায় ফাস্টিং ব্লাড গ্লুকোজ, ইনসুলিন ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও তা ডায়াবেটিসের চিকিৎসার বিকল্প নয়। রসুনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহ-বিরোধী ভূমিকা নিয়ে গবেষণায় সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন (সিআরপি) ও টিএনএফ-আলফা কমানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে। তবে 'লিভার ডিটক্সিফিকেশন' বা শরীর থেকে সব বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়ার মতো ব্যাপক দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাজা রসুন থেঁতো বা ক্রাশ করে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে কাঁচা খাওয়া বা রান্নার শেষ দিকে যোগ করাই অ্যালিসিনের উৎপাদন বাড়ানোর সহজ পদ্ধতি। তবে প্রতিদিন ঠিক '১-২ কোয়া' খেতেই হবে—এমন কোনো সর্বজনস্বীকৃত ক্লিনিক্যাল ডোজ নেই। খালি পেটে রসুন খাওয়ার বাড়তি স্বাস্থ্য-উপকারেরও শক্ত প্রমাণ নেই; বরং সংবেদনশীল পেটের ব্যক্তিরা খাবারের সঙ্গে বা হালকা খাবারের পর রসুন খেলে বেশি স্বস্তি পেতে পারেন। দীর্ঘদিন সংরক্ষিত বা আগে থেকে মিহি করা রসুনের চেয়ে তাজা রসুনই উত্তম। সাধারণ খাবারের পরিমাণে রসুন বেশিরভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ হলেও বেশি পরিমাণে খেলে মুখে ও শরীরে দুর্গন্ধ, পেটের অস্বস্তি, গ্যাস বা বমিভাব হতে পারে। যারা ওয়ারফারিন, অ্যাসপিরিন বা অন্য রক্তপাত-প্রভাবিত ওষুধ সেবন করেন, তাদের রসুনের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। গর্ভাবস্থা বা স্তন্যদানের সময়ও বেশি মাত্রার রসুনের সাপ্লিমেন্ট এড়িয়ে চলা ভালো। সবচেয়ে বড় কথা, রসুন কখনোই ওষুধের বিকল্প নয়; উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগের চিকিৎসা চললে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।