মানবজাতির মহাকাশ যাত্রার ইতিহাসে যোগ হলো নতুন এক মাইলফলক। পৃথিবীর কক্ষপথে অবস্থানকালে নভোচারীরা প্রথমবারের মতো নিজেদের শরীরের এক্স-রে করেছেন — আর সেই পরীক্ষার ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটে করে যাত্রা শুরু করেছিল ফ্রাম২ মিশন। পোলার অরবিটে মানুষের প্রথম এই মহাকাশযাত্রায় ছিলেন চারজন নভোচারী — ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগকারী চুন ওয়াং, চলচ্চিত্র নির্মাতা জ্যানিক মিকেলসেন, প্রকৌশলী রাবেয়া রগ ও অভিযাত্রী এরিক ফিলিপস। তাঁরা পৃথিবীর কক্ষপথে সাড়ে তিন দিন অতিবাহিত করেন এবং সেখানে একাধিক বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। সেই পরীক্ষাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল নিজেদের শরীরের এক্স-রে পরীক্ষা। বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী রেডিওলজিতে এই ঐতিহাসিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।
গত চার দশক ধরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নভোচারীদের জন্য অত্যাধুনিক আলট্রাসাউন্ড মেশিনসহ উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। তবে এক্স-রে মেশিন কখনোই সেই তালিকায় স্থান পায়নি — কারণ সাধারণ এক্স-রে মেশিনের আকার এত বিশাল যে তা মহাকাশে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু বহনযোগ্য প্রযুক্তির বিকাশের ফলে সেই অসম্ভব কাজ এখন সম্ভব হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মেয়ো ক্লিনিকের অ্যারোস্পেস মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণার প্রধান লেখক শেইনা গিফোর্ড বলেছেন, মহাকাশে অসুস্থতা বা আঘাত নির্ণয়ের জন্য একাধিক ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা অ্যারোস্পেস মেডিসিনের জন্য একটি বড় স্বপ্ন ছিল। তিনি আরও জানান, এক্স-রে দ্রুত, সহজ এবং রোগ নির্ণয়ে অত্যন্ত কার্যকর।
ফ্রাম২ মিশন প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীর কক্ষপথে এবং মাইক্রোগ্রাভিটির মধ্যেও নিখুঁত এক্স-রে করা সম্ভব। ভাসমান পরিবেশে স্থির হয়ে এক্স-রে করা কঠিন হবে — এমন ধারণাই প্রথমে ছিল বিজ্ঞানীদের। তবে গবেষকেরা এই মিশনের জন্য একটি বহনযোগ্য ও তারহীন এক্স-রে সিস্টেম বেছে নিয়েছিলেন। মিশনের চারজনের মধ্যে তিনজনকে মাত্র চার ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দিয়ে এই যন্ত্র ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয়েছিল। মহাকাশে থাকাকালীন দুই নভোচারী নিজেদের হাত, বাহু, পেট, পেলভিস এবং বুকের এক্স-রে করেন। পৃথিবীতে ফেরার পর রেডিওলজিস্টরা সেই ছবিগুলোর সঙ্গে মহাকাশে যাওয়ার আগে ও পরে তোলা একই অঙ্গের এক্স-রে ছবির তুলনা করেন। আশ্চর্যজনকভাবে ছবির সামগ্রিক মানের দিক থেকে পৃথিবী ও মহাকাশে তোলা এক্স-রেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি। গবেষকেরা নিশ্চিত করেছেন, রোগ নির্ণয়ের জন্য এই বহনযোগ্য সিস্টেমটি সম্পূর্ণ উপযুক্ত।
নাসা ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর মানুষকে আবারও চাঁদে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য মঙ্গলে মানুষের অভিযান। মানুষ যখন পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশের আরও গভীরে দীর্ঘ সময়ের জন্য যাত্রা করবে, তখন রোগ নির্ণয়ের জন্য আরও বেশি যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হবে। আলট্রাসাউন্ডের তুলনায় এক্স-রে স্ক্যান করা অনেক সহজ এবং সামান্য প্রশিক্ষণেই দ্রুত ফলাফল বিশ্লেষণ করা যায়।
এক্স-রে যে শুধু মানুষের জন্যই কাজে লাগবে তা নয় — মহাকাশযানের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ভেতরের অবস্থা দেখার জন্যও এটি দারুণ কাজে আসতে পারে। এই মিশনে নভোচারীরা একটি স্মার্টওয়াচেরও এক্স-রে করে দেখেছেন, যা প্রমাণ করে যন্ত্র না খুলেই এর ভেতরের নিখুঁত অবস্থা জানার একমাত্র উপায় হতে পারে এই প্রযুক্তি। মহাকাশে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির জন্য নভোচারীদের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস এবং স্পেস স্যুটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোর জন্য এক্স-রে অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন গবেষকেরা। সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান।




