সিরাজগঞ্জের বিসিক শিল্পপার্কে গ্যাস-সংযোগের অভাবে বিনিয়োগে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন উদ্যোক্তারা। উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প প্লট বরাদ্দ পেলেও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় অনেকেই কারখানা স্থাপনের কাজ থামিয়ে রেখেছেন। ব্যাংক ঋণও পাচ্ছেন না তারা, কারণ অবকাঠামোর ঘাটতি বিনিয়োগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রায় ৪০০ একর জমির ওপর সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলী, পশ্চিম মোহনপুর, বনবাড়িয়া, বেলটিয়া ও মোরগ্রাম মৌজায় এই পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। ২০১০ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল এবং প্রাথমিকভাবে ২০১৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাতবার মেয়াদ বাড়ানোর পরও ২০২৪ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক কাজ এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় প্রথমে ছিল ৩৭৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যা পরে বেড়ে দাঁড়ায় ৭১৯ কোটি ২১ লাখ টাকায়।

গ্যাস সংযোগের অবকাঠামো নির্মাণে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (পিজিসিএল) দায়িত্ব নিয়েছিল। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ২০২২ সালের ২০ জুন পিজিসিএলের অনুকূলে ৭৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা জমা দেয়। কিন্তু পার্কের প্রধান ফটক পর্যন্ত পাইপলাইন বসানোর পর কাজ থেমে গেছে; ভেতরের লাইন স্থাপনের কাজ এখনও শুরু হয়নি। নানা জটিলতায় চার বছর ধরে ঝুলে আছে এই প্রকল্প। উদ্যোক্তারা বলছেন, এতে তারা আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েছেন। দেশে চলমান গ্যাস-সংকট তাদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের পরও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অনিয়ম সংক্রান্ত একটি মেমো জারি করে। পরবর্তীতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যানকে তাগিদপত্র পাঠায়। এরপর ২০ এপ্রিল শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিসিক শাখাও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের কাজ দ্রুত শেষ করতে তাগিদপত্র দেয়।

শিল্পপার্কের প্রধান কর্মকর্তা হিরণ্ময় বর্দ্ধন জানান, পিজিসিএল অভ্যন্তরীণ গ্যাসলাইন স্থাপনের কাজ শেষ না করায় উদ্যোক্তারা বিসিককে চাপ দিচ্ছেন। বিষয়টি একাধিকবার পিজিসিএলকে জানানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও তাগিদপত্র দিয়েছে। বিসিক আবারও তাগাদা দেবে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, প্লটগুলোয় মাটি ভরাটের কাজও শেষ হয়নি। যমুনা পেপার অ্যান্ড বোর্ড ফ্যাক্টরির স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম আজাদ জানান, চারটি প্লট পেয়েও তিনি বুঝতে পারছেন না কীভাবে এগোবেন, কারণ গ্যাস ও অন্যান্য সুবিধা অনিশ্চিত। জিলানি অয়েল মিলের স্বত্বাধিকারী আবদুল কাদের ছয়টি প্লট পেয়েছেন; মাটি ভরাট অসম্পূর্ণ থাকায় নিজ খরচে তা সম্পন্ন করেছেন। তিনি দ্রুত গ্যাস পেলে কারখানা চালু করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন। যমুনা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ইকবাল হাসান জানান, সমবায় সমিতির মাধ্যমে দুটি প্লট বরাদ্দের টাকা দিয়েছেন। এখন শুনছেন গ্যাস নেই। গ্যাসলাইন না থাকলে ব্যাংকও বিনিয়োগ করবে না। আবদুর রাজ্জাক নামের এক উদ্যোক্তা বলেন, গ্যাস-সংযোগের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই তিনি প্লট নিয়েছিলেন। কিন্তু এখনও গ্যাসলাইন স্থাপিত না হওয়ায় বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন।

বিসিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৭৫ একর জমিতে এ, বি ও এস—এই তিন শ্রেণিতে ৮২৯টি প্লট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫০টি প্লট বিদেশি এবং ২৭৯টি প্লট দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য রাখা হয়েছে। এ শ্রেণির প্লট ২০ হাজার বর্গফুট, বি শ্রেণির ১০ হাজার বর্গফুট এবং এস শ্রেণির প্লটের আয়তন ৬ থেকে ২৬ হাজার বর্গফুট পর্যন্ত। দুই ধাপে ২৭২টি প্লট দেশীয় উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

গ্যাস-সংযোগের অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক উদ্যোক্তা। স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বিসিক শিল্পপার্কে দ্রুত গ্যাস-সংযোগ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে। সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্ক শিল্প উদ্যোক্তা মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, জ্বালানি ও গ্যাসের ব্যবস্থা না থাকলে এখানে কেন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন? ব্যাংকও ঋণ দেবে না। দ্রুত গ্যাসলাইন স্থাপনসহ সব ধরনের সেবা নিশ্চিত না হলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের কিস্তির টাকা কেউ জমা দেবেন না বলে উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) এস এম তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। কাজ শেষ হওয়ার পর সরকারের পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ থাকলে সংযোগ দেওয়া হবে। অন্যদিকে, শিল্পপার্কের প্রধান ফটকের পাশে এসেই থেমে আছে গ্যাসের পাইপ লাইনের কাজ।