শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে কোনো শ্রমিক যেন চাকরি হারাতে না পারেন, সেই লক্ষ্যে সরকারের কাছে নির্দেশনা জারির দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রম আইন কার্যকর করা এবং মজুরি বোর্ড গঠনেরও তাগিদ দিয়েছেন নেতারা। শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির পক্ষ থেকে এসব দাবি উপস্থাপন করা হয়। সংগঠনটির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সমাবেশের পর পল্টন এলাকায় একটি মিছিল বের করা হয়।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশটি পরিচালনা করেন সংগঠনের সহসভাপ্রধান নুরুল ইসলাম। এতে আরও বক্তব্য রাখেন শ্রমিকনেতা মিজানুর রহিম চৌধুরী, হযরত বিল্লাল, সাবিনা আক্তার এবং মামুন ইসলাম। সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন আউটসোর্সিং কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নুরুল হক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলিফ দেওয়ান এবং বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি সৈকত আরিফ।

বক্তারা উল্লেখ করেন, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দুই বছরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে পোশাক খাত এবং এর শ্রমিকরা একাধিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। এই সময়ে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বলে তারা জানান। পাশাপাশি, গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যার ফলে শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনও দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। তাই শ্রমিক এবং শিল্প—দুটির স্বার্থেই জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জ্বালানি সমস্যাকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করার পথ যাতে বন্ধ হয়, সেজন্য সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারির দাবি জানান শ্রমিকনেতারা। তাদের অভিমত, কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকদের দ্রুত পুনর্বাসন এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে পুরো শ্রম খাতই সংকটে পড়বে। সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার তার বক্তব্যে বলেন, চলতি বছর শ্রম আইনে কিছু ইতিবাচক সংস্কার হয়েছে যা শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় সহায়ক। তবে এই সংস্কারগুলো কার্যকর না হলে আইনটি নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে। শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বৈষম্য ও হয়রানি থেকে সুরক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এখনই আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তাসলিমা আখতার আরও বলেন, জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমে গেলে এর ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে সাধারণ শ্রমিকদের উপর। ফলে শিল্প এবং শ্রমিক—উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় এই সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, শিল্পের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা কিংবা জ্বালানি ঘাটতির দায় শ্রমিকদের কাঁধে চাপিয়ে তাদের ছাঁটাই করা বন্ধ করতে হবে। শ্রমিকদের সুরক্ষার মাধ্যমেই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। সমাবেশ শেষে সংগঠনের নেতাকর্মীরা পল্টন এলাকায় একটি মিছিল প্রদক্ষিণ করেন।

শ্রমিকনেতারা আরও উল্লেখ করেন, শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি প্রতি তিন বছর পর পর পুনর্নির্ধারণের যে বিধান রাখা হয়েছে, তাতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা না করে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, উৎপাদনশীলতা এবং শ্রমিকের জীবনমানের পরিবর্তন নিয়মিত বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ও ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি না বাড়লে শ্রমিকরা চরম সংকটে পড়বেন বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাই মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়ে ন্যায্য মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম শুরু করার জোর দাবি জানানো হয়।