যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর আশায়। কিন্তু ফলাফল আশাব্যঞ্জক নয়। আটলান্টা ফেডারেল রিজার্ভের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ নির্বাহী মনে করেন তাদের প্রতিষ্ঠানে এআই এখনো উল্লেখযোগ্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পারেনি। ২০২১ সালের পর থেকে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার উন্নতির পেছনে দূরবর্তী কর্মপদ্ধতি বা অন্যান্য কারণ বেশি দায়ী হতে পারে, এআই নয়। প্রযুক্তি খাতের কর্মছাঁটাইয়ের প্রভাবও এই পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হতে পারে।
এই সুফলের অভাবের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক মা ও তাঁর সহযোগীরা। তাঁদের গবেষণা বলছে, এআই-নির্ভর কর্মছাঁটাই ও তার ফলে সৃষ্ট চাকরির অনিশ্চয়তা কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নষ্ট করছে। এই ছাঁটাই কর্মীদের এআইয়ের প্রতি মনোভাবকে নেতিবাচক করে তোলে, যা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতার অন্যতম শক্তিশালী পূর্বাভাসক। তাই বিনিয়োগকারীদের স্পষ্ট বার্তা: এআইয়ের নামে কর্মী ছাঁটাই একটি স্ববিরোধী কৌশল, যা প্রত্যাশিত সুফল বাতিল করে দেয়।
গবেষক দলটি গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের পাবলিক কোম্পানির শত শত এআই বিনিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের ঘোষণা, হাজার হাজার আর্থিক প্রতিবেদন এবং কর্মীদের লাখ লাখ পর্যালোচনা বিশ্লেষণ করেছেন। গ্লাসডোর ডটকমের পর্যালোচনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এআই সম্পর্কিত মন্তব্যগুলো সামগ্রিক পর্যালোচনার তুলনায় অনেক বেশি নেতিবাচক। কর্মীরা করপোরেট এআই গ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন এবং প্রযুক্তিটির প্রতি বিরূপ মনোভাব দেখাচ্ছেন।
প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তথ্যের ভিত্তিতে কর্মীদের এআইয়ের প্রতি মনোভাব ও উৎপাদনশীলতার মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, এআই-বিরোধী মনোভাব উৎপাদনশীলতা কমায়। গবেষকরা দেখেছেন, যখন কোনো কোম্পানি এআইয়ের কারণে ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয়, কর্মীদের মধ্যে এআইয়ের প্রতি মনোভাব দ্রুত নেতিবাচক হয়ে ওঠে। অনেক কর্মী সহকর্মীদের চাকরি হারানোর ঘটনা দেখেছেন বা নিজে পরবর্তী হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন। সম্প্রতি রয়টার্স ও ইপসোসের জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকানদের অর্ধেকই আশঙ্কা করছেন যে এআই তাদের পরিবারের কারও চাকরি কেড়ে নিতে পারে।
এই বিরূপ মনোভাবের পেছনের কারণগুলোও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। চাকরি হারানোর ভয় ছাড়াও প্রশিক্ষণের অভাব, দক্ষতা উন্নয়নের সীমিত সুযোগ, করপোরেট এআই নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং এআইয়ের উৎপাদনশীলতা নিয়ে সন্দেহ বিরাজ করছে। তবে চাকরির নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অপরদিকে, ব্যবস্থাপনার মনোভাব ভিন্ন। প্রায় দশ হাজার উপার্জন-কলের প্রতিলিপি বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, ব্যবস্থাপনার এআই সম্পর্কিত আলোচনা সবসময়ই আশাবাদী। কিন্তু এই আশাবাদ উৎপাদনশীলতার ফলাফলের সঙ্গে কোনো উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক দেখায়নি। সংক্ষেপে, ব্যবস্থাপনার উচ্ছ্বাসের চেয়ে কর্মীদের মনোভাবই এআইয়ের সুফল উন্মোচনের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু কেন কোম্পানিগুলো এআই বিনিয়োগের সঙ্গে ছাঁটাইকে যুক্ত করছে? গবেষণায় বলা হয়েছে, পাবলিক কোম্পানির ব্যবস্থাপকরা স্বল্পমেয়াদি লাভজনকতা ও শেয়ারের দামের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেন। তাই বড় বিনিয়োগের পর দ্রুত ফল দেখানোর চাপ তৈরি হয়। ধারণা করা হয়, যদি এআই কর্মীদের দক্ষ করে তোলে, কম কর্মী প্রয়োজন হবে। ফলে শ্রম খরচ কমিয়ে দ্রুত প্রত্যাবর্তনের একটি সহজ পথ হলো ছাঁটাই। কিছু কোম্পানি এআইয়ে বিনিয়োগের আগেই কর্মী ছাঁটাই করে, যাতে ভবিষ্যতের বিনিয়োগের জন্য পুঁজি মুক্ত করা যায়।
শেয়ারবাজারের প্রতিক্রিয়াও এই কৌশলের ব্যর্থতা নির্দেশ করে। ছাঁটাইয়ের ঘোষণার পর গড়ে শেয়ারের দাম প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। ব্লক নামের একটি প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে দাম বেড়েছিল, কিন্তু অর্ধেকের বেশি ঘটনায় বাজারের প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক বা শূন্যের কাছাকাছি ছিল। এই নিস্তেজ প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয়, এই সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে লুকানো খরচ রয়েছে যা এআইয়ের সুফলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
গবেষকদের মতে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের উচিত কর্মীদের অনুভূতি ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া। কর্মীদের বোঝাতে হবে যে এআই তাদের সঙ্গে কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রকৃত প্রতিশ্রুতি — সুফল ভাগ করে নেওয়া, দক্ষতায় বিনিয়োগ করা এবং সুযোগ সম্প্রসারণ করা। যারা চাকরির অনিশ্চয়তার খরচ বুঝবে এবং কর্মীদের সঙ্গে এআইয়ের সুফল ভাগ করবে, তারাই বিনিয়োগ থেকে প্রকৃত লাভ করতে সক্ষম হবে।
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে ফরচুন ডটকমে প্রকাশিত হয়েছিল এবং দ্য কনভার্সেশন থেকে ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে পুনর্প্রকাশ করা হয়েছে। লেখক মার্ক মা, পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়।




