ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে আমরা যে প্রতিযোগিতা দেখি, তার আড়ালে কি লুকিয়ে থাকে আরও গভীর কোনো গল্প? ২০২৬ সালের আসর শেষ হওয়ার পর এই কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, গত একশো বছরে এই টুর্নামেন্ট কেবল ক্রীড়ানৈপুণ্যের প্রদর্শনী ছিল না; বরং ভূরাজনীতি, যুদ্ধ, একনায়কতন্ত্র, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক আধিপত্য বিস্তারের একটি সুক্ষ্ম হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল।

বিশ্বকাপের অভিষেক আসর থেকে বিতর্কের সূত্রপাত। ১৯৩০ সালের ফাইনালে আয়োজক উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার মধ্যে বল নিয়ে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। দুই দলই নিজেদের বল ব্যবহারে জোর দিলে ফিফা সভাপতি জুলে রিমে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার ও দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের হালকা ‘টি-মডেল’ বল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। ফলে প্রথমার্ধে ২-১ গোলে এগিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়ার্ধে বলের ভিন্নতার কারণে পুরোপুরি খেই হারিয়ে ফেলে এবং উরুগুয়ে ৪-২ গোলে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। এই জয় ও পরাজয় দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে শত বছরের ফুটবল দ্বৈরথের বীজ বপন করে দেয়।

ফ্যাসিবাদী একনায়ক বেনিতো মুসোলিনি ১৯৩৪ সালের আসারকে তাঁর শাসনকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। ইতিহাসবিদদের গবেষণায় উঠে এসেছে, সেমিফাইনালের আগের রাতে রেফারি ইভান একলিন্ডকে ব্যক্তিগত নৈশভোজে দাওয়াত দেওয়া হয়। অস্ট্রিয়ার কিংবদন্তি স্ট্রাইকার জোসেফ বিকান আজীবন দাবি করেছিলেন, সেই রেফারি ঘুষ গ্রহণ করেছিলেন। সেই একই রেফারি পরে ফাইনালেও দায়িত্ব পান, যেখানে ইতালি চেকোস্লোভাকিয়াকে হারিয়ে শিরোপা জেতে। ১৯৩৮ সালের ফাইনালের আগে মুসোলিনি প্রত্যেক খেলোয়াড়কে পাঠিয়েছিলেন ভয়ংকর এক বার্তা: “জিতে এসো, নইলে মরো।” হাঙ্গেরির গোলরক্ষক পরাজয় মেনে নিয়েও বলেছিলেন, তিনি চার গোল হজম করলেও ইতালির খেলোয়াড়দের জীবন বাঁচিয়েছেন।

আর্জেন্টিনার ডার্টি ওয়্যার যখন তুঙ্গে, তখনই তারা ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করে। ইতিহাসবেত্তা জোনাথন উইলসন এর মতে, একনায়ক জেনারেল হোর্হে রাফায়েল ভিদেলা বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের একটি স্থিতিশীল সরকার হিসাবে তুলে ধরতে। সবচেয়ে মর্মন্তুদ তথ্য হলো, বুয়েনস আইরেসের যে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে ম্যাচ চলছিল, তার কয়েক গজ দূরেই ছিল নৌবাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র ইএসএমএ। স্ট্যাডিয়ামে দর্শকদের গোলের উল্লাসে সেই নির্মম যন্ত্রণার চিৎকার চাপা পড়ছিল। ঐতিহাসিক ৬-০ গোলের পেরু ম্যাচটি নিয়েও উঠে আসে আর্জেন্টিনা ও পেরুর সামরিক সরকারের মধ্যে গোপন অর্থনৈতিক সমঝোতা, বিশেষত শস্য রপ্তানি ও ঋণদানের বিনিময়ের অভিযোগ।

১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত ছিল আর্জেন্টিনা সমাজে। তারই প্রতীকী প্রতিশোধ হিসেবে দিয়েগো ম্যারাডোনা ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়াটার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করেছিলেন সেই কুখ্যাত “হ্যান্ড অব গড” গোল। ম্যারাডোনা পরে স্বীকার করেছেন, এটি ছিল নিহত আর্জেন্টাইন সৈনিকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন।

২০২৬ সালের আসার কেন্দ্রে জড়িয়ে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ। ফেব্রুয়ারিতে ইরানে অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু করেই। এই রক্তাক্ত অভিযান ও হাজারো মানুষের মৃত্যুর মধ্যেই শুরু হয় বিশ্বকাপ। অধ্যাপক ও ইতিহাস বিশারকদের মতে, বিশ্বকাপ ছিল বিশ্ববাসীর মনোযোগ যুদ্ধ থেকে সরিয়ে আনন্দে মগ্ন রাখার এক চিরায়ত কৌশল। আর একটি নজিরবিহীন ঘটনা তৈরি হয় যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্টিনোকে ফোন করে ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের সাজা স্থগিত করার অনুরোধ জানান। ফিফার সে অনুরোধ রক্ষা করা নিয়া আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

আরেক বিতর্কিত ঘটনা ঘটে বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত সোমালিয়ার রেফারি ওমর আব্দুলকাদির আরতানের সাথে। বৈধ ভিসা ও কূটনীতিক পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও মার্কিন কাস্টমস মায়ামি বিমান বন্দরে তাকে “ভেটিং উদ্বেগ” দেখিয়ে আটক করে দেশে ফেরত পাঠায়। যুক্তরাষ্ট্র যাকে অগ্রহণযোগ্য মনে করল, তাকে উয়েফা সম্মানজনক সুপার কাপ ফাইনাল পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করে।

বিশ্বকাপের পণ্য-পূজা ও অর্থনৈতিক প্রভাবও প্রশ্নবিদ্ধ। ইউরোপীয় ক্লাবের বৈশ্বিক আধিপত্য ও প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের ফিফার রেকর্ড আয়ের মধ্যে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো নিছক প্রতিভা সরবরাহকারী হয়ে আছে। সমাজবিজ্ঞানীর মতো তাত্ত্বিকদের দৃষ্টিতে, বিশ্বকাপ হলো একটি নিখাদ সিমুলেশন যেখানে আনন্দের আড়ালে রাজনীতি, অর্থ ও ক্ষমতার জটিল সমীকরণ পর্দার অন্তরালে থেকে যায়। ইতিহাস পর্যালোচনা করে প্রশ্নটি থেকেই যায়, বিশ্বকাপ কি সব সময় কেবল খেলার গল্প বলেছে?