মানুষের জীবনে মা-বাবার স্থান ও গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁদের ভালোবাসা ও ত্যাগের কোনো তুলনা হয় না। ইসলাম ধর্মে মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের প্রতি কর্তব্য পালনকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, সন্তানের জন্য মা-বাবার সেবা করা এবং তাঁদের সন্তুষ্টি অর্জন করা অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

প্রথমত, মা-বাবার সঙ্গে সর্বদা নম্র ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা উচিত। তাঁদের বয়সজনিত কারণে কোনো বিষয়ে ধীরগতি বা একই কথা বারবার বলার প্রবণতা দেখা দিলে বিরক্ত হয়ে কণ্ঠস্বর উঁচু করা বা ধমক দেওয়া সম্পূর্ণ অনুচিত। পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তাঁদের ধমক দেওয়া যাবে না এবং তাঁদের সঙ্গে সদালাপ করতে হবে। একটি কঠিন শব্দও তাঁদের মনে গভীর আঘাত দিতে পারে, তাই কথায় যেন সম্মান ও ভালোবাসা থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, মা-বাবাকে ইচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট দেওয়া বা অবহেলা করা মারাত্মক অন্যায়। কোরআনে তাঁদের প্রতি ‘উফ্’ বলতেও নিষেধ করা হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় তাঁদের প্রতি কোনো রকমের খারাপ ব্যবহার বা মানসিক আঘাত দেওয়া কত বড় পাপ। বিনা কারণে কাউকে কষ্ট দেওয়া ইসলামে নিন্দনীয়, আর মা-বাবার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

তৃতীয়ত, মা-বাবার জন্য নিয়মিত দোয়া করা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উত্তম মাধ্যম। তাঁরা জীবিত থাকলে সুস্থতা, ঈমান ও কল্যাণের জন্য দোয়া করা উচিত। আর তাঁরা ইন্তেকাল করলে তাদের মাগফিরাত ও রহমতের জন্য দোয়া করা সন্তানের দায়িত্ব। কোরআনে শেখানো দোয়ায় মা-বাবার প্রতি দয়ার প্রার্থনা করা হয়েছে, যেমন তাঁরা শৈশবে স্নেহে লালন-পালন করেছেন।

চতুর্থত, সামর্থ্য অনুযায়ী মা-বাবার সেবা করা উত্তম ইবাদত। তাঁদের চিকিৎসা, ওষুধপত্র বা দৈনন্দিন কাজে সহযোগিতা করা সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে নবীজি (সা.) তাঁকে মা-বাবা জীবিত থাকলে তাঁদের সেবায় মনোনিবেশ করতে বলেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, মা-বাবার সেবা জিহাদের চেয়েও উত্তম কাজ হতে পারে।

পঞ্চমত, বৈধ বিষয়ে মা-বাবার কথা মানা এবং তাঁদের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা উচিত। তবে কোনো নির্দেশ যদি আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে নিয়ে যায়, তাহলে তা মানা যাবে না। কিন্তু এমন ক্ষেত্রেও তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার বা সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েজ নয়। কোরআনে বলা হয়েছে, তারা যদি আল্লাহর সঙ্গে শরিক করতে পীড়াপীড়ি করে, তবুও তাদের আনুগত্য করা যাবে না, তবে দুনিয়ায় তাঁদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করতে হবে।

ষষ্ঠত, মা-বাবার প্রয়োজন ও অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। তাঁদের শুধু বস্তুগত জিনিস সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়, বরং তাঁদের মানসিক যত্নও প্রয়োজন। সন্তানের কাছ থেকে সময়, মনোযোগ সহকারে কথা শোনা বা পাশে বসে কিছুক্ষণ গল্প করা তাঁদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। হাদিসে রয়েছে, এক ব্যক্তি হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন, কিন্তু মা-বাবাকে কাঁদিয়ে আসায় নবীজি (সা.) তাঁকে ফিরে গিয়ে তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ থেকে বোঝা যায়, মা-বাবার মানসিক শান্তি নিশ্চিত করা কত বড় ইবাদত।