রাজধানীর কাফরুলে ময়লা ব্যবসা, ফুটপাত দখল এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি বলেছে, এটি কোনো পৃথক ঘটনা নয়। বরং নগর ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের একটি বিপজ্জনক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটেছে এতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি এই অবৈধ অর্থনীতির ভিত্তি ধ্বংস করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের বক্তব্যে উঠে এসেছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে নগর সেবাকেন্দ্রিক অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় আধিপত্যের বিষয়টি স্পষ্ট। তাঁর মতে, এটি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা নগরভিত্তিক অবৈধ অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার একটি ভয়াবহ বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, দেশের রাজনীতিতে এখনও এমন একটি সংস্কৃতি বিদ্যমান, যেখানে দলীয় পদ-পদবি ও রাজনৈতিক পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে জনসেবার পরিবর্তে অবৈধ অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এই রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির অবসান হবে বলে মানুষের প্রত্যাশা থাকলেও তা পূরণ হয়নি বলে উদ্বেগ জানানো হয়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে আইপিডি জানিয়েছে, নাগরিকেরা হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করার পরও অনেক সময় আলাদাভাবে ময়লা অপসারণের জন্য অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এই অস্বচ্ছ ব্যবস্থা চাঁদাবাজি ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সিটি করপোরেশন চাইলে আধুনিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুরো ময়লা সংগ্রহ ও অপসারণ কার্যক্রম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের অবসান ঘটাতে পারে।
একইসঙ্গে ফুটপাত, সরকারি জমি, খাল, জলাশয়, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান দখল করে একটি শক্তিশালী নগর মাফিয়াতন্ত্র গড়ে উঠেছে বলে মত প্রকাশ করেছে আইপিডি। রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তির কারণে এসব দখলদারি দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকায় নাগরিকদের চলাচল, পরিবেশ ও জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিকল্পিত নগর উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আইপিডির মতে, সিটি করপোরেশনগুলোতে দীর্ঘদিন নির্বাচিত কাউন্সিলর বা জনপ্রতিনিধি না থাকায় এবং প্রশাসকদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালিত হওয়ায় জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অবৈধ গোষ্ঠী আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ছাড়া নগর ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে মনে করে সংস্থাটি।
এ অবস্থায় আইপিডি সাত দফা সুপারিশ উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে: রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দখলদারিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, ময়লা সংগ্রহব্যবস্থা পুরোপুরি সিটি করপোরেশনের অধীনে আনা, ফুটপাত ও সরকারি জমি দখলমুক্ত করা, নগর সেবাসংক্রান্ত সব ইজারা ও আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দ্রুত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন পরিচালনা এবং নগরভিত্তিক অবৈধ অর্থনীতি নির্মূলে সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।




