আমেরিকার বৃহত্তম বইয়ের দোকান শৃঙ্খল বার্নস অ্যান্ড নোবেলের প্রধান নির্বাহী জেমস ডন্টের প্রিয় বই লিও টলস্টয়ের ‘আনা কারেনিনা’। তবে এই বইটি তিনি কখনো শেষ পর্যন্ত পড়তে পারেননি। তিনি জানান, উপন্যাসটি পড়তে বেশ কয়েকবার ফিরে গেছেন, কিন্তু প্রতিবারই শেষের আগে থামিয়ে দিয়েছেন, যাতে আবারও বইটির কাছে ফেরার অনুভূতিটি ধরে রাখতে পারেন। দেশের বৃহত্তম বইয়ের দোকান শৃঙ্খলের প্রধান হিসেবে এটি অস্বাভাবিক অভ্যাস মনে হতে পারে, কিন্তু ডন্টের ক্যারিয়ার কখনোই প্রচলিত ধারার ছিল না।
বার্নস অ্যান্ড নোবেল, ওয়াটারস্টোনস এবং নিজের ডন্ট বুকস শৃঙ্খল পরিচালনার আগে তিনি কার্নিভাল ক্রুজ লাইন্সে পার্সার হিসেবে কাজ করেছেন। জাহাজে প্রশাসনিক, আর্থিক ও অতিথি-সম্পর্কিত দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। এরপর ১৯৮৫ সালে নিউইয়র্কে গিয়ে জেপিমরগানে বিনিয়োগ ব্যাংকার হিসেবে যোগ দেন তিনি। ব্যবসায়িক সফর উপভোগ করলেও দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, ব্যাংকিং তাঁর পেশা নয়। ২০১৮ সালে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ভালো অফিসের চাকরি ছেড়ে পেশাগতভাবে আরও আকর্ষণীয় কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত সেই পেশা ছিল বই বিক্রি, বিশেষ করে ভ্রমণবিষয়ক বই। ১৯৯০ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরে লন্ডনের মেরিলিবোন এলাকায় প্রথম ডন্ট বুকস শাখা খোলেন। ছোট উদ্যোগটি ধীরে ধীরে লন্ডনের একটি স্বতন্ত্র শৃঙ্খলে পরিণত হয়, যা বই দেখার সুবিধাজনক পরিবেশ, অভিজ্ঞ বিক্রেতা এবং আলো ধরার জন্য সামান্য উঁচু করে সাজানো তাকের জন্য পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটির এডওয়ার্ডিয়ান যুগের অভ্যন্তর, ওক কাঠের তাক, স্কাইলাইট ও বড় খিলানযুক্ত জানালা পর্যটক ও গ্রাহকদের আকর্ষণের বড় কারণ। ২০১০ সালে ডন্ট বুকস পাবলিশিং প্রতিষ্ঠিত হয়।
২০১১ সালে বিপর্যস্ত ব্রিটিশ খুচরা বিক্রেতা ওয়াটারস্টোনসের দায়িত্ব নেন ডন্ট। তার আগে প্রতিষ্ঠানটি অ্যামাজনের মতো অনলাইন বিক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছিল না, একের পর এক সিইও প্রতিষ্ঠানটিকে দেউলিয়ার কিনারায় নিয়ে যান। ডন্ট ছোট বইয়ের দোকানের মানসিকতা প্রয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটিকে ২০০৮ সালের মন্দার পর প্রথমবারের মতো মুনাফায় নিয়ে আসেন। তিনি খারাপ পারফরম্যান্সের শাখা বন্ধ করে দেন এবং দোকান ব্যবস্থাপকদের নিজেদের মতো বই বেছে নেওয়ার ক্ষমতা দেন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা নীতি তৈরি হয়—বই বিক্রি একটি স্থানীয় বিষয়।
সবশেষে বার্নস অ্যান্ড নোবেলকে ঘুরিয়ে দাঁড় করানো তাঁর চ্যালেঞ্জ। ২০১৯ সালে কোম্পানিটি ৬৮৩ মিলিয়ন ডলারে অধিগ্রহণের পর ডন্টকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সব দোকানের জন্য একই নিয়ম প্রয়োগ না করে স্থানীয় বই বিক্রেতাদের বই সাজানোর নিয়ন্ত্রণ দেন, যাতে প্রতিটি দোকান তার এলাকার মানুষের রুচি প্রতিফলিত করতে পারে। ফলে ইউনিয়ন স্কয়ারের শাখায় সাহিত্যিক ফিকশন ও নিউইয়র্কের লেখকদের বই বেশি থাকতে পারে, অন্য শাখায় রোমান্স, তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক বা আঞ্চলিক ইতিহাসের বই বেশি থাকতে পারে। দোকানগুলোকে নিজস্ব প্রদর্শনী তৈরি করতে, হাতে লেখা সুপারিশ দিতে উৎসাহিত করা হয়।
ডন্টের মতে, আমেরিকান গ্রাহকরা অনেক বই কেনেন, যা যুক্তরাজ্যের গ্রাহকদের চেয়ে বেশি। এই কৌশলে বার্নস অ্যান্ড নোবেলের পুনরুদ্ধার নাটকীয়। ২০১৯ সালে যেখানে দোকান ছিল প্রায় ৬১৭টি, এখন তা বেড়ে ৭১৭টিতে দাঁড়িয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ আরও শাখা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য আইপিও নিয়েও গুঞ্জন রয়েছে, তবে কবে এবং আদৌ পাবলিক হবে তা স্পষ্ট নয়। আইপিওর বিষয়ে উদ্বিগ্ন ডন্ট বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি ভালো বইয়ের দোকান চালানোর চেষ্টা করছে, যার বেশিরভাগ প্রচেষ্টা স্থানীয় পর্যায়ে হচ্ছে। তাঁর মতে, ছোট দোকান থেকে বড় শৃঙ্খল—সব ক্ষেত্রেই মূল নীতি একটাই, যা একটি ভালো বইয়ের দোকান তৈরি করে।




