প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপলের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে বাজার পরিস্থিতি। বিক্রি বৃদ্ধির হার মন্থর, মেমরি চিপের বর্ধিত দামে মুনাফার মার্জিনে ধস নামার আশঙ্কা — এরই মাঝে আরও একটি বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কোম্পানিটির শেয়ার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা প্রকাশ করল। সোমবার জেফরিজ ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম অ্যাপলের স্টক রেটিং ‘হোল্ড’ থেকে কমিয়ে ‘আন্ডারপারফর্ম’-এ নামিয়ে আনে, যাকে ‘সেল’ রেটিংয়ের সমতুল্য হিসেবে ধরা হয়। একইসাথে কোম্পানিটির শেয়ারের লক্ষ্যমাত্রাও ২৮৫.৫৬ ডলার থেকে কমিয়ে ২৬৩.৬৬ ডলারে নির্ধারণ করা হয়েছে।
জেফরিজের বিশ্লেষকরা অ্যাপলের সাপ্লাই চেইন পর্যালোচনা করে দেখেছেন যে, আইফোনের ২০তম বার্ষিকী উপলক্ষে পরের বছর যে অল-গ্লাস আইফোন চালুর গুঞ্জন ছিল, সেটি বাতিল করা হয়েছে। এর পাশাপাশি মেমরি চিপের দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াই এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে তাদের অগ্রগতির সীমিত সম্ভাবনাও রেটিং কমানোর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইফোনে নতুন ফর্ম ফ্যাক্টর এনে গড় বিক্রয়মূল্য (এএসপি) বাড়ানোর প্রচেষ্টা যে প্রত্যাশার চেয়ে কঠিন, এই বাতিলকরণ সেটাই প্রমাণ করে। উল্লেখ্য, অল-গ্লাস আইফোনটি প্রিমিয়াম দামে বিক্রির আশা করেছিল জেফরিজ।
আগামী মাসে অ্যাপল তাদের প্রথম ফোল্ডেবল ফোন উন্মোচন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ফোল্ডেবল ফোনটিই এখন কোম্পানির মার্জিন ধরে রাখার একমাত্র চালিকাশক্তি। তবে মেমরি খরচ বেড়ে যাওয়ায় ২৫৬ গিগাবাইট ভার্সনের দাম ২,১৯৯ ডলার এবং ২ টেরাবাইট ভার্সনের দাম ৩,০৯৯ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে তারা প্রক্ষেপণ করছে।
ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে কমপক্ষে ছয়টি ওয়াল স্ট্রিট প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের শেয়ারে ‘সেল’ রেটিং দিয়েছে, যা ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ। উল্লেখ্য, ২০১২ সালেই প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের মৃত্যুর কিছুদিন পর এমন সংখ্যক নেতিবাচক রেটিং দেখা গিয়েছিল। এর আগে জুলাই মাসে আইফোনের চাহিদা নিয়ে উদ্বেগ দেখিয়ে কিব্যাঙ্ক ক্যাপিটাল মার্কেটস তাদের ভ্যালুয়েশন ‘আন্ডারওয়েট’-এ নামিয়ে আনে।
জুলাইয়ের শেষদিকে অ্যাপল জানায়, চলতি ত্রৈমাসিকে আইফোনের বিক্রি (যা তাদের ব্যবসার প্রায় অর্ধেক) ‘মিড-টিনস’ শতাংশ হারে বাড়বে। গত ত্রৈমাসিকে এই হার ছিল ২২ শতাংশ, ফলে এই ঘোষণা মন্দার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। সেই সাথে চলতি ত্রৈমাসিকে মোট মুনাফার মার্জিনেও চাপ পড়বে বলে কোম্পানিটি স্বীকার করেছে।
এই সংকটের মধ্যেই আগামী মাসে দীর্ঘদিনের সিইও টিম কুকের স্থলাভিষিক্ত হয়ে জন টার্নাস প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নিতে চলেছেন। আইফোনের বার্ষিক উন্মোচন অনুষ্ঠানটি সেপ্টেম্বরের শুরুতে হওয়ার কথা, যেখানে প্রথম ফোল্ডেবল ফোনটি দেখানো হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ফরচুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই উদ্যোগ এবং কোম্পানির পুরনো পণ্য ডিজাইনের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা নিয়ে টার্নাস এই দায়িত্ব নিচ্ছেন।
কম্পিউটার মেমোরির খরচ অ্যাপলসহ বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য ক্রমাগত মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ম্যাক এবং আইপ্যাডের দাম বাড়ানোর পেছনেও এই কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এআই চালানোর জন্য তৈরি ডেটা সেন্টারে মেমোরি চিপের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হওয়ায় এর ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। টিম কুক সম্প্রতি জানিয়েছেন, ডিআরএএম মেমোরি চিপের বাজার মূলত তিনটি কোম্পানি — মাইক্রন, এসকে হাইনিক্স এবং স্যামসাং — নিয়ন্ত্রণ করায় সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অ্যাপল চীনের সিএক্সএমটির মেমোরি চিপ পরীক্ষা করছে বলে জানা গেছে। তবে এই পদক্ষেপ নিলে হোয়াইট হাউসের আপত্তির মুখে পড়তে পারে। অ্যাপল তার এআই প্রযুক্তি সরাসরি ব্যবহারকারীদের ডিভাইসে চালানোর পরিকল্পনা করছে, যা গোপনীয়তা সচেতন ব্যবহারকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হবে বলে কুক মনে করেন। তিনি বলেন, ডিভাইসে কিছু অনুরোধ প্রসেস করার ক্ষমতা কৌশলগতভাবে একটি প্রতিযোগিতামূলক অস্ত্র হিসেবে কাজ করবে।




