বিশ্বায়ন নিয়ে বিশ্বজুড়ে দুই দশক ধরেই তর্ক-বিতর্ক চলছে, কিন্তু গত এক বছরে ব্রেক্সিট ও মার্কিন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো জনতুষ্টিবাদীর জয়ের পর এর ভবিষ্যৎ নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই দুটি ঘটনাই মূলত বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এসেছে। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে বিশ্বায়নের কুপ্রভাব এড়াতে চেয়েছে, আর বিশ্বায়নের নেতৃত্বদানকারী দেশ আমেরিকাতেই বিশ্বায়নবিরোধী স্লোগানে জিতেছেন ট্রাম্প। এর আগে শুধু গরিব দেশগুলোর মুখেই বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল, এখন সেই কাতারে যোগ হয়েছে ধনী দেশগুলোর মানুষেরাও। বাস্তবে, বিশ্বায়নবিরোধী সবচেয়ে তীব্র আন্দোলন এখন উন্নত দেশগুলোতেই দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ‘বিশ্বায়ন কি সত্যিই সবার উন্নয়ন আনতে পারবে’—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই স্টিগলিৎজ লিখেছেন ‘মেকিং গ্লোবালাইজেশন ওয়ার্ক’।

স্টিগলিৎজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বইটির ভিত্তি। বিল ক্লিনটনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করার সময় তিনি দেখেছেন, হোয়াইট হাউস ও বিশ্বব্যাংকের কেন্দ্রে বসে কীভাবে নীতি তৈরি হয়। বিশ্বব্যাংক ছাড়ার পর তিনি প্রথমে লেখেন ‘গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ইটস ডিসকনটেন্টস’, যেখানে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরেন। বর্তমান বইয়ের মুখবন্ধে তিনি জানান, সমস্যার কোনো জাদুকরি সমাধান না থাকলেও নীতি প্রণয়ন, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও বিধিবিধানে পরিবর্তন এনে বিশ্বায়নকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কার্যকর করা সম্ভব। চীন উত্পাদন ও ভারত আউটসোর্সিংয়ে সফল হওয়ায় বৈশ্বিক নীতিতে ইতিমধ্যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বইটির প্রথম অধ্যায়ে স্টিগলিৎজ দেখান, গত দেড় শতকে জাতিরাষ্ট্রই ছিল রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্র, কিন্তু বিশ্বায়নের কারণে তার ভূমিকা সংকুচিত হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তি ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের চাপে দেশগুলো একে অপরের সঙ্গে অঙ্গীভূত হচ্ছে, ফলে সমন্বয়হীনতা দেখা দিচ্ছে। বাণিজ্য, পুঁজি ও পরিবেশের মতো সমস্যা এখন বৈশ্বিক পরিসরেই সমাধান করতে হবে। স্টিগলিৎজের মতে, অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের গতি রাজনৈতিক বিশ্বায়নের চেয়ে অনেক বেশি, ফলে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা হয়ে পড়েছে বিশৃঙ্খল। বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রীরা আইএমএফে অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করলেও তাদের সিদ্ধান্তের পরিবেশ বা স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে ভাবেন না। একইসঙ্গে জাতিরাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আনুগত্য এখনো অটুট, যার উদাহরণ ইরাক যুদ্ধে দেখা যায়, যেখানে মার্কিন সেনাদের মৃত্যুতে হিসাব রাখা হলেও ইরাকিদের প্রাণহানি উপেক্ষিত ছিল।

মুক্ত বাণিজ্য প্রসঙ্গে স্টিগলিৎজ বলেন, ইতিহাসে কোনো বাণিজ্য চুক্তিই ছিল না মুক্ত ও ন্যায্য। উন্নত দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে নানা অশুল্ক বাধা ও ভর্তুকি দিয়ে উন্নয়নশীল দেশের পণ্য বাজার থেকে দূরে রাখে। ১৯৯৪ সালে হওয়া নাফটা চুক্তির উদাহরণ টেনে তিনি দেখান, মেক্সিকোর বাজার খুলে দিলেও দেশটি তেমন লাভবান হয়নি; বরং মার্কিন ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষিপণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের কৃষকরা। একইসাথে, আমদানির ওপর অশুল্ক বাধা আরোপের কারণে মেক্সিকোর টমেটো রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হয়। স্টিগলিৎজের প্রস্তাব, স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে কোনো শর্ত ছাড়াই বাজার খুলে দিতে হবে এবং শুধু সমতা নয়, ন্যায়সংগতভাবে প্রাধিকারমূলক সুবিধা দিতে হবে।

বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের অধিকার নিয়েও স্টিগলিৎজের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। ট্রিপস চুক্তির মাধ্যমে উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ওষুধের উচ্চ দাম নিশ্চিত করতে পেটেন্ট মানতে বাধ্য করেছে, যার ফলে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের ওপর করপোরেট স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি বলেন, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের যৌক্তিক মূল্যে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া স্থানীয় জ্ঞান সংরক্ষণ ও বায়োপাইরেসি বন্ধের ওপর জোর দেন তিনি। বইয়ের শেষে স্টিগলিৎজ ‘নিউ গ্লোবাল সোশ্যাল কনট্রাক্ট’-এর প্রস্তাব দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে ন্যায্য বাণিজ্য, উন্নয়নশীল দেশের পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্যমূল্য, জিডিপির ০.৭ শতাংশ সহায়তা, ঋণ মওকুফের আওতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো সংস্কার। তিনি আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাঠামো সংস্কারেও গুরুত্ব দিয়েছেন, যেখানে অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তিতে ভোটের ক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়। পরিশেষে তিনি বলেন, বড় দেশের ছড়ি ঘোরানো রুখতে এবং সবাইকে সমান সুযোগ দিতে জাতিরাষ্ট্রের স্বকীয়তা রেখে এমন একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা সম্ভব হলে বিশ্বায়ন সত্যিই সবার কল্যাণে কাজে লাগবে।