২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় নিভে যায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলো। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কবি শামসুর রাহমান জীবনের ৭৭ বছর পূর্ণ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জীবদ্দশাতেই তিনি বাংলাদেশের প্রধান কবি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত ছিলেন এবং তাঁর কবিতা বাংলা সাহিত্যের কাঠামোয় এনেছিল নতুন মাত্রা। কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশে সময় লেগেছিল প্রায় এক যুগ। নিজের কবিতার স্বতন্ত্র সুর ও শৈলী গড়ে তোলার প্রতিই ছিল তাঁর এই দীর্ঘ অপেক্ষার মূল কারণ।

শামসুর রাহমানের কবিতার বিশাল অংশ জুড়ে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক রূপান্তরের ছবি। তিনি মনে করতেন, প্রতিটি মানুষের জীবনই এক একটি ওডিসি, যার ঘটনাবহুলতা ও বৈচিত্র্য ভিন্ন ভিন্ন। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি কবিতায় অতীত-বর্তমান, বোধ-মেধা, মিথ-রাজনীতি, সমাজ ও সম্পর্ককে এক সূত্রে গেঁথেছেন। শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শিল্প-সাহিত্যের একটি দেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর দ্রোহ প্রতিফলিত হয়েছে কবিতায়। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে ব্যঙ্গ করে লিখেছেন ‘হাতির শুঁড়’ কবিতা, আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘ইসরায়েলের স্যামশন’ আখ্যা দিয়ে কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় লিখেছেন ‘টেলেমেকাস’।

১৯৬৭ সালে রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সরকারি পত্রিকায় চাকরি থাকা সত্ত্বেও বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন তিনি। ১৯৬৮ সালে আইয়ুব খান সব ভাষার জন্য অভিন্ন রোমান হরফ চালুর প্রস্তাব দিলে মাতৃভাষার ওপর আঘাতের প্রতিবাদে লেখেন ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত আসাদের রক্তমাখা শার্ট হাতে মিছিল দেখে তিনি রচনা করেন কালজয়ী কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। ওই শার্টকে তিনি দেখেছিলেন প্রাণের পতাকা হিসেবে, যা বাঙালির চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায় উড়ে চলেছে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শামসুর রাহমানের কবিতার এক গুরুত্বপূর্ণ উপজীব্য। ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থে তিনি পুরাণের ব্যবহার করে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে শাণিত করেছেন। স্বাধীনতা পেতে রক্তগঙ্গা পার হওয়ার যে বেদনা, খাণ্ডবদাহনের সেই মিথের মধ্য দিয়ে তা ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর কবিতায় স্থান পেয়েছে হাড্ডিসার অনাথ কিশোরী, শাহবাজপুরের জোয়ান কৃষক, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি কিংবা ঢাকার রিকশাওয়ালা—যাঁরা সবাই ঘর ছেড়ে স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগে এগিয়ে এসেছিলেন।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন এবং শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন সোচ্চার। সামরিক স্বৈরাচারের উত্থানের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা ‘মেষতন্ত্র’ যেন এক মোক্ষম অস্ত্র। কবিতাটিতে শাসক ও জনতার সম্পর্ক ফুটে উঠেছে মালিক ও মেষের প্রতীকে, যেখানে জনতা নিরুপায় হয়ে দিনাতিপাত করে। স্বাধীনতার চেতনা থেকে বিচ্যুতি দেখে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ কবিতায়, যেখানে তিনি আক্ষেপ করেছেন যে মুক্তিযুদ্ধ বৃথা যাচ্ছে।

নাগরিক জীবনের হতাশা, বিচ্ছিন্নতা ও অস্তিত্বের সংকটও তাঁর কবিতার অন্যতম বিষয়। ‘ইকারুশের আকাশ’ কাব্যগ্রন্থে তিনি নিজেকে নাগরিক কবি হিসেবে প্রকাশ করেছেন। তবে তাঁকে শুধু নাগরিক কবির গণ্ডিতে বাঁধা যায় না, কারণ তাঁর কবিতার পরিধি অনেক বিস্তৃত। ‘আমিও বনের ধারে’, ‘আমার প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘কবিতা তোমার সঙ্গে’, ‘টানেলে একাকী’-র মতো কবিতায় প্রকৃতি, প্রেম ও আত্মার গভীর অন্বেষণ ফুটে উঠেছে। সমালোচক হুমায়ুন আজাদের মতে, শামসুর রাহমান পঞ্চাশের কাব্যপ্রতিভা হিসেবে তাঁর কবিতায় বাস্তবতা ও সমকালকে ধারণ করেছেন, যার কারণে তিনি বাংলাদেশের প্রধান কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। নতুন শতাব্দীর শূন্য দশক পর্যন্ত তাঁর কবিতা যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে গেছে, তার পেছনে রয়েছে কাব্যশৈলী, উপমা, প্রতীক ও ভাষার অনন্য সমন্বয়।