বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও লেখক জহির রায়হানের জন্মদিনে তাঁর জীবন ও কর্মের এক বিস্তৃত চিত্র ফুটে উঠেছে। লেখক মতিউর রহমানের বিভিন্ন লেখায় জহির রায়হানের যে রূপটি পাওয়া যায়, তা কেবল একজন শিল্পী হিসেবে নয়, বরং একজন আপসহীন সংগ্রামী মানুষ হিসেবে। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর প্রভাব অপরিসীম। শহীদুল্লা কায়সার এবং আলতাফ মাহমুদের মতো জহির রায়হানও ছিলেন একুশের চেতনার একনিষ্ঠ বাহক। এই তিন শহীদের জীবন এবং করুণ পরিণতি যেন একে অপরের পরিপূরক; যেখানে কায়সার ও মাহমুদকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, वहीं স্বাধীনতার পর অগ্রজ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হন রায়হান, যা পরবর্তীতে মিরপুরে তাঁর শাহাদাতের মাধ্যমে জানা যায়।
জহির রায়হানের রাজনৈতিক সক্রিয়তা ছিল তাঁর সৃজনশীলতার মূল চালিকাশক্তি। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হওয়া এই লেখক বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির কর্মী ছিলেন এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলের শুরুর দিকেই কারাবরণ করেন। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ছাত্র ইউনিয়ন এবং সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির বিভিন্ন কাজে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। তিনি কেবল আর্থিক সাহায্যই করেননি, বরং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাট্যরূপায়ণেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। এমনকি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রস্তুতিমূলক বৈঠকের খরচ বহন করতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন, যদিও পরিস্থিতির কারণে সেই বৈঠক সম্ভব হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় কলকাতায় থেকে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বহুমুখী কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে জহির রায়হানের অন্বেষণ ছিল মূলত মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের। তাঁর কবিতায়, গল্পে এবং উপন্যাসে বারবার ফিরে এসেছে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি। ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ ও ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসের পাশাপাশি তাঁর জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ একুশের চেতনাকে সাধারণ মানুষের মাঝে পৌঁছে দিয়েছিল। তবে তাঁর দূরদর্শিতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ‘আর কত দিন’ (লেট দেয়ার বি লাইট) উপন্যাসে। ১৯৭১ সালের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অনেক আগেই তিনি এই উপন্যাসে একটি মৃত নগরী এবং লাশের স্তূপের কথা লিখেছিলেন, যা পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঢাকা শহরের বাস্তব দৃশ্যের সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ‘তপু’র মৃত্যু যেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত এক করুণ ট্র্যাজেডির প্রতীক।
জহির রায়হানের শিক্ষা ও পেশাগত জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। নোয়াখালী এবং ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। সহকারী পরিচালক হিসেবে শুরু করে তিনি মোট ১০টি ছবি পরিচালনা এবং ৮টি ছবি প্রযোজনা করেন। তাঁর ‘কাঁচের দেয়াল’ চলচ্চিত্রটি ব্যাপক পুরস্কার লাভ করে। এছাড়া যুদ্ধের সময় ‘স্টপ জেনোসাইড’ ও ‘বার্থ অব নেশন’ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে তিনি বিশ্ববাসীকে গণহত্যার কথা জানান। সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসটি অত্যন্ত আলোচিত। তাঁর বন্ধু গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল প্রগাঢ়, যার প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর বইগুলোর প্রকাশনা ও প্রচ্ছদ সজ্জায়।
ব্যক্তিগত জীবনে কিছু সমালোচনা থাকলেও, জহির রায়হান ছিলেন প্রগতিশীল চেতনার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তাঁর জীবন ও কাজ প্রমাণ করে যে তিনি আজীবন মানবমুক্তির আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। বর্তমান সময়ের সাংস্কৃতিক অরুচি ও রাজনৈতিক দ্বিধায় জহির রায়হানের সৃষ্টিগুলো যেন জীবনের প্রয়োজনীয় ‘আগুন’ হয়ে আমাদের পথ দেখায়। তাঁর অপূর্ণ স্বপ্ন—যেমন ‘আর কত দিন’ চলচ্চিত্রের রূপায়ন—ভবিষ্যতের কোনো সাহসী চলচ্চিত্রকারের মাধ্যমে পূর্ণ হবে, এটাই প্রত্যাশা। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে শেষবার তাঁর সাথে দেখা হওয়ার পর আর কথা হয়নি, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার আজও অম্লান।



