প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক সলিমুল্লাহ খানের একটি গভীর বিশ্লেষণী প্রবন্ধ সম্প্রতি অনলাইনে প্রকাশের মাধ্যমে নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছেছে। লেখাটি মূলত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানের ভেতরে ধর্মীয় ভাবনার জটিল স্তরগুলোকে উন্মোচন করার চেষ্টা করেছে। ফকির লালন শাহের গান থেকে ধার করা ‘সাকার’, ‘আকার’ ও ‘নিরাকার’ এই তিনটি ধারণাকে কেন্দ্র করে প্রবন্ধটি রচিত হয়েছে। লেখক এই তিনটি শব্দকে ফরাসি দার্শনিক জাক লাকাঁর ‘ইমাজিনারী’, ‘সিম্বলিক’ ও ‘রিয়েল’ ধারণার সাথে তুলনা করেছেন। লাকাঁর মতে, ‘ইমাজিনারী’ হলো ছবি বা মূর্তির জগৎ, যা ‘সাকার’-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ; আর ‘সিম্বলিক’ হলো ভাষা বা শব্দের জগৎ, যা ‘আকার’ হিসেবে চিহ্নিত। সবশেষে ‘রিয়েল’ হলো সেই নিরাকার সত্য — যেমন মৃত্যু বা ঈশ্বর — যা কোনো প্রতীকে ধরা পড়ে না।

প্রবন্ধটির মূল বক্তব্য হলো, ভাষা ব্যবহারের মুহূর্তেই নিরাকার সত্তা একটি আকার বা প্রতীকে পরিণত হয়। নজরুলের গানে ‘আল্লাহ’ এবং ‘রসুল’ শব্দের ব্যবহার এই তত্ত্বকে স্পষ্ট করে তোলে। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহ নিরাকার, কিন্তু তাঁর নাম উচ্চারণ করার সাথে সাথেই তিনি একটি শব্দের আকারে ‘সিম্বলিক’ জগতে আবির্ভূত হন। লেখক দেখিয়েছেন, নজরুল তাঁর গানে আল্লাহ ও রসুলকে বোঝাতে বিভিন্ন ধরনের রূপক (মেটাফর) ও লক্ষণা (মেটোনিমি) ব্যবহার করেছেন। যেমন একটি গানে আল্লাহ ও রসুলকে একসাথে ‘ফুল’ বলা হয়েছে, আবার অন্য গানে আল্লাহকে ‘তরু’ (গাছ) এবং রসুলকে সেই তরুর ‘ফুল’ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। আরেকটি গানে আল্লাহকে ‘বীজ’ এবং রসুলকে সেই বীজ রোপণের ‘জমির পত্তনীদার’ বলা হয়েছে — যা ইসলামি আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য ব্যাখ্যা।

নজরুলের নবী বন্দনায় বৈষ্ণব পদাবলির প্রভাবও প্রকট। তিনি নবী মোহাম্মদকে শুধু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নন, বরং প্রেমের গৌরাঙ্গ হিসেবে ‘সাকার’ রূপে দেখেছেন। কবির কল্পনায় নবী কখনো ‘মদিনার সওদাগর’, কখনো ‘দুলা’, আবার কখনো মেষ চরাতে যাওয়া ‘কিশোর রাখাল’ রূপে ধরা দিয়েছেন। নবীর শারীরিক সৌন্দর্য বর্ণনায় তিনি ‘চাঁদ’ এবং ‘ফাগুন-পূর্ণিমা’র মতো রূপক ব্যবহার করেছেন। এমনকি নবীকে ‘আমিনা-লালা’, ‘গোলাপ’, ‘সোনার চাঁদ’ ইত্যাদি নানা নামে ডেকে তাঁর প্রতি ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ করেছেন।

শুধু সাকার নয়, নজরুলের গানে শব্দের ‘লক্ষণা’ বা নামান্তর প্রক্রিয়াও লক্ষণীয়। তিনি নবী ‘আহমদ’ শব্দের মধ্যে থাকা ‘মিম’ অক্ষরটিকে অপসারণের মাধ্যমে ‘আহাদ’ (এক) শব্দে পৌঁছেছেন, যেটি আল্লাহর একত্বের ইঙ্গিত বহন করে। এই প্রক্রিয়াটিকে লেখক রূপকের চেয়ে লক্ষণার উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা মূলত গদ্যসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য। তবে নজরুলের ক্ষেত্রে এই লক্ষণা প্রয়োগও তাঁর কবিতাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। লালন ফকিরের গানেও একই লক্ষণার ব্যবহার দেখা যায়, কিন্তু নজরুলের প্রয়োগ স্বতন্ত্র ও মৌলিক।

প্রবন্ধের উপসংহারে বলা হয়েছে, চাহিদা সাকারের সঙ্গে যুক্ত, আর বাসনা আকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু প্রাণের চরম আরাধনা হলো নিরাকারের প্রতি। নিরাকার ‘রিয়েল’-এর সন্ধান পাওয়া অসম্ভব বলেই মনে করেন লাকাঁ — ‘দি রিয়েল ইজ ইমপসিবল’। এই নিরাকার সত্তাই আকার ও সাকারকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। এই তত্ত্বকে খণ্ডন করলে ঈশ্বর ও নিরীশ্বরের মধ্যে পার্থক্য থাকে না। নজরুলের সেই বিখ্যাত গানের মতোই — ‘নিরাকার তুমি নিরঞ্জন ব্যাপিয়া আজ ত্রিভুবন’ — নিরাকারের এই ব্যাপ্তিই নজরুলের বাসনার মূল সুর। সলিমুল্লাহ খানের মতে, নজরুলের এই গভীর আধ্যাত্মিক জগৎকে সম্পূর্ণ বুঝতে ফ্রয়েডের ‘অজ্ঞাতসার’ তত্ত্ব ও লাকাঁর ভাষাতত্ত্বের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।