মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা ক্রমশ বাস্তব রূপ নিচ্ছে। টানা নবম রাতেও ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে আরেকজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়। অন্যদিকে, ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এই তিনটিই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাষ্ট্র, এবং বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তর অবস্থিত।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ৮৮ ডলার ছাড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম ৪ ডলারে পৌঁছেছে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সোমবার সৌদি আরবের বিরুদ্ধে লোহিত সাগরে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করেছে, যা তেলের সরবরামে নতুন করে ধাক্কা দিতে পারে। হুতিরা বলেছে, সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় সৌদি আরব তেল রপ্তানির জন্য পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের পথ ব্যবহার করছিল। এর আগে হুতিরা ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের সময়ও সেখানে জাহাজে হামলা চালিয়ে পথটি ব্যাহত করেছিল।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তাদের হামলা ইরানি সামরিক কমান্ড সেন্টার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূল নজরদারি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন লঞ্চার এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, তাবরিজ শহরে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া খুজেস্তান, হরমোজগান ও সিস্তান-বালুচেস্তান প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়েছে বলে তারা জানায়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে কয়েকটি ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলার দায় স্বীকার করেছে।
পাল্টা হামলার জবাবে জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানি ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এতে বেসামরিক বিমান চলাচল বিপন্ন হচ্ছে। কুয়েতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ইরানি ব্যারেজের মোকাবিলা করেছে। ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, সোমবার দ্বিতীয় একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালীতে হামলার শিকার হয়েছে, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে ছিল। অপর একটি জাহাজ ওমানের উপকূলের কাছে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আগুন ধরে যায় এবং ক্রুরা জাহাজ ছেড়ে পালিয়ে যায়।
যুদ্ধের মাঝেই কূটনৈতিক সমাধানের আভাস মিলছে। ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি সোমবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসবেন বলে জানা গেছে। পাকিস্তান যুদ্ধরত দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকা নিচ্ছে। গত মাসে যে অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তা ভেঙে পড়ায় এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা চাইলে আমরা ভালো খবর পাব।’ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানের সঙ্গে আলোচনার পক্ষে, তবে তা বাস্তবসম্মত হতে হবে। তিনি বলেন, ‘ইরানের ভেতরে কেউ যদি গঠনমূলক কিছু করতে চায় এবং নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাহলে তা ইতিবাচক হবে। কিন্তু আমরা বর্তমানে সেই অবস্থানে নেই।’
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সর্বশেষ মার্কিন হামলায় ৫০ জন নিহত ও ৫১৭ জন আহত হয়েছে। অন্যদিকে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৭ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। সম্প্রতি জর্ডানে হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হন এবং তৃতীয় একজন নিখোঁজ রয়েছেন। ইরাকে একটি ইরানি ড্রোন ‘নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে’ ধ্বংস করার সময় আরেক সেনা নিহত হন বলে পেন্টাগন জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘ইরান যখনই একজন মার্কিন সেনা হত্যা করবে, তাদের সে হত্যার বহুগুণ মূল্য দিতে হবে।’ ট্রাম্প ডোভার এয়ার ফোর্স বেসে এক সেনার মরদেহ গ্রহণের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।




